দলগুলোর অস্থি-মজ্জায় দলতন্ত্র যেন মিশে গেছে
বাংলাদেশের গ্রাম-যে গ্রাম একসময় ছিল নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কাশবনের মতো শান্ত, যেখানে রাজনীতি ছিল পাড়ার মুরব্বির পরামর্শ, আর নির্বাচন ছিল সামাজিক আস্থার এক উৎসব-সেই গ্রাম আজ দলীয় প্রতীকের রঙে সয়লাব। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে, আর সেই স্রোতের ভেতর দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চরিত্র বদলে গেছে ধীরে ধীরে, কখনো অদৃশ্যভাবে, কখনো প্রবল ঝড়ে। দলীয়করণের এ যাত্রা যেন এক দীর্ঘ মহাকাব্য-যেখানে ক্ষমতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পৃষ্ঠপোষকতা, আর মানুষের আশা-নিরাশার গল্প একসূত্রে গাঁথা।
স্বাধীনতার পর প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছিল যেন গ্রাম-বাংলার সহজ-সরল জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। সেই সময় দলীয় পরিচয় ছিল দূরবর্তী শহুরে শব্দ। গ্রামের ছবি ছিল অন্যরকম, যেখানে নিয়ামক ছিল ব্যক্তির চরিত্র, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, আর মুরব্বিদের আস্থা। কিন্তু ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় গ্রাম শাসনের ধারণা, রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় প্রশাসনিক পুনর্গঠন-সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতির অঙ্কুর ধীরে ধীরে গ্রামে শেকড় ছড়াতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলো বুঝল-গ্রামই হলো ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি। এভাবেই শুরু হলো দলীয় প্রভাবের অনানুষ্ঠানিক যুগ। এ সময়টিকে বলা যায় দলীয়করণের অদৃশ্য, কিন্তু গভীরপর্ব।
গ্রাম-বাংলার প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ যেন হয়ে উঠল জাতীয় দলের একেকটি শাখা। উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি সম্পদ-সবকিছুই ধীরে ধীরে দলীয় আনুগত্যের সুতোয় বাঁধা পড়তে লাগল। গ্রামের মানুষ বুঝতে শুরু করল-উন্নয়ন চাইলে দলকে মানতে হবে, সেবা চাইলে পরিচয় দেখাতে হবে। রাজনীতি তখন আর শুধু শহরের সংসদ ভবনে কিংবা সচিবালয়ে সীমাবদ্ধ থাকল না; এটি নেমে এলো গ্রাম-বাংলার উঠোনে, চায়ের দোকানে, হাটের মোড়ে, এমনকি কৃষকের জমির আলেও।
২০১৬ সালে হলো গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চালু হলো দলীয় প্রতীকভিত্তিক নির্বাচন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চরিত্র পালটে গেল এক লহমায়। যে ইউনিয়ন পরিষদ একসময় ছিল সামাজিক নেতৃত্বের প্রতীক, সেটি হয়ে উঠল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুদ্ধক্ষেত্র। দলীয় প্রতীক যেন শুধু একটি চিহ্ন নয়-এটি হয়ে উঠল ক্ষমতার হাতিয়ার আর রাজনৈতিক সংঘর্ষের ক্ষেত্র। গ্রাম-বাংলার শান্ত মাঠে তখন শুরু হলো নতুন নাটক-একই দলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের উত্তেজনা, আর নির্বাচনের দিনগুলোতে চরম অস্থিরতা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পৃষ্ঠপোষকতা যেন এক পুরোনো নদী-যা কখনো শুকায় না। দলীয়করণের এ নদী আরও গভীর হলো স্থানীয় সরকারে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বুঝলেন, দলীয় পরিচয়ই তাদের ক্ষমতার পুঁজি। সরকারি প্রকল্প, ঠিকাদারি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি-সবকিছুই দলীয় আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামের মানুষও বুঝল, সেবা পেতে হলে দলকে মানতে হবে। এভাবে স্থানীয় সরকার আর নাগরিক সেবার প্রতিষ্ঠান থাকল না, বরং হয়ে উঠল দলীয় ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র।