বিদেশে উচ্চশিক্ষা: যেভাবে পুশ-পুলের ফাঁদে আমাদের তরুণেরা
অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে আমার পরিচিত এক শ্রীলঙ্কান শিক্ষার্থী আছে। একসময় আমরা একই বাসায় থাকতাম। তার দৈনন্দিন জীবন ছিল একটানা ছুটে চলার মতো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সে কখনো রেস্তোরাঁয়, কখনো ক্লিনিং কোম্পানিতে কাজ করত। এর বাইরে উবারে খাবারও ডেলিভারি দিত। প্রায়ই মাঝরাতের পর বাসায় ফিরত। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে রেস্তোরাঁর কাজে চলে যেত।
একদিন কাজ করতে গিয়ে তার হাত ভেঙে যায়। কয়েক দিন কাজে যেতে না পারায় ম্যানেজার তাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দেন।
দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স করতে সে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছে। এই ডিগ্রি অর্জনে বাংলাদেশি মুদ্রায় তার প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হবে। তার বাবা চিকিৎসক। বোন পড়তে গেছে বেলারুশে, সেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে এই তরুণকে যেভাবে টিকে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে, সেটিই আজকের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীজীবনের এক নির্মম বাস্তবতা।
বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও খুব ভিন্ন নয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সব শহরেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে পড়াশোনার পাশাপাশি কঠিন শ্রমের মধ্য দিয়ে জীবন চালাতে হয়। বিদেশে নিকটজন বা আত্মীয়স্বজন না থাকলে বিপদে পাশে দাঁড়ানোর কিংবা সহযোগিতা পাওয়ার মানুষও সহজে মেলে না। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অনেকের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—কীভাবে টিকে থাকা যায়।
কেন দেশ ছাড়তে চান তরুণেরা
বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্তকে সাধারণত দুটি ধারণার আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়—‘পুশ’ ও‘পুল’ ফ্যাক্টর। পুশ ফ্যাক্টর হলো সেই সব বাস্তবতা, যা মানুষকে নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য বা উৎসাহিত করে। এর মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সীমিত সুযোগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে পুল ফ্যাক্টর হলো গন্তব্য দেশের আকর্ষণ। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার সুযোগ, আন্তর্জাতিক ডিগ্রির মর্যাদা, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, উন্নত জীবনযাত্রা এবং তুলনামূলক নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ শিক্ষার্থীদের বিদেশে টানে।
তবে এই পুশ-পুল কাঠামো দিয়ে পুরো বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যক্তির ক্যারিয়ার-পরিকল্পনা, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা, একাডেমিক উৎকর্ষের স্বপ্ন এবং সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। এখানে ব্যক্তির নিজস্ব সক্ষমতা ও উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের মেধা, যোগ্যতা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লক্ষ্য পূরণের যে ক্ষমতা, সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘এজেন্সি’ বলা হয়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত তারও প্রকাশ।
ব্রনফেনব্রেনারের সামাজিক পরিবেশতত্ত্ব অনুযায়ী ব্যক্তির বিকাশ শুধু ব্যক্তিগত সক্ষমতার ফল নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ—সবকিছুই ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করে। বিদেশে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্তও তাই কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বপ্ন যেমন জড়িত, তেমনি জড়িত দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাস্তবতা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিদেশে উচ্চশিক্ষা