‘তৌহিদী জনতা’ কেন নৌকাবাইচ বন্ধ করতে চায়?

বিডি নিউজ ২৪ খান মো. রবিউল আলম প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫৫

সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুনাই নদীর কুলঘেঁষে বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা উৎসবটি স্রেফ নৌকাবাইচ নয়; ধর্ম, বর্ণ ও বয়সের সীমানা ভেঙে মানুষের এক হয়ে ওঠার যৌথ স্মৃতি। কিন্তু সেই চিরায়ত ঐতিহ্যের ঘাটে যখন ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি আসে, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক গভীর সামাজিক সংকট।


কিন্তু এ বছর প্রথমবারের মতো স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ফেইসবুকে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নাম ধারণ করে নৌকাবাইচের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করে এবং তা বন্ধে প্রচারণায় নামে। এ প্রতিযোগিতার আয়োজন হলে পরিস্থিতি খারাপ হবে বলে তারা ঘোষণা দেয়।


সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কারো বাধার মুখে সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধ হবে না বলে দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “নৌকাবাইচ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলা। এটি ‘তৌহিদী জনতা’ বা কারো বাধার কারণে থেমে থাকবে না। স্থানীয়রা বসে সমাধান না করতে পারলে, আমরা বসে সমাধান করে দেব।” উপজেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে লাউতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে স্থানীয় লোকদের নিয়ে বসে এ সমস্যার সমাধান করতে বলেছে। প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। নৌকাবাইচের নির্ধারিত তারিখ ২৮ অগাস্ট ২০২৬। দেখা যাক, পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়!


কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন তৌহিদী জনতা এ রকম গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলা বন্ধ করতে চাইছে? কেন এ ধরনের লোকমুখীন উৎসবের প্রতি কঠোর হচ্ছে? এই উত্তর পাওয়া যাবে হুমায়ুন আজাদের ‘প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, ‘‘মানুষ বাস করে বহু বিধিনিষেধের মধ্যে, জীবনযাপনের একঘেয়ে ক্লান্তির মধ্যে দিনের পর দিন আবর্তিত হয় তার রক্তমাংস-আবেগ, মরচে ধরে তার জীবনে। উৎসব তাকে মুক্তি দেয় একঘেয়ে জীবনযাপনের অন্ধকূপ থেকে, উৎসব মানুষকে সমুদ্রের স্বাদ দেয়। উৎসব মানুষের শিথিল ইন্দ্রিয়গুলোকে আবার ঘষেমেজে সজীব করে তোলে; জীবনের ক্লান্তি দূর করে মানুষকে জীবনের দিকে নিয়ে যায়।।’’ এসব তথাকথিত তৌহিদী জনতা উৎসব, আনন্দ ও উদযাপনকে ভয় পায়।


উৎসব কোনো বিধিবদ্ধ আয়োজন নয়, উন্মুক্ত জনসমাবেশ; যেখানে হৃদ্যতা, সংযোগ আর আনন্দই মূল বিষয়। সমাজের সংগতি ও সম্প্রীতি ধরে রাখার অন্যতম শক্তি এসব উৎসব। উৎসব সমাজ নামের বিনিসূতার মালার মূল সংযোগ তৈরি করে। উৎসব মূলত ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণিনিরপেক্ষ। উন্মুক্ত উৎসব টিকলে সমাজ টিকবে।


অন্যদিকে, প্রতিক্রিয়াশীলরা একটি বদ্ধ ও নির্দেশিত সমাজ নির্মাণে সচেষ্ট থাকে। তারা মুক্ত সমাজকে ভয় পায়; নির্মল আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে ভয় পায়। তারা বাধ্যতামূলক উৎসবের পক্ষে, স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব তাদের পছন্দ নয়। স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব মানুষকে সমান কাতারে দাঁড় করায়, ঘটায় প্রাণের সংযোগ। মানুষ এসব উৎসবে যেতে চায়, অংশ নিতে চায়।


নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়, লাঠিখেলা, পহেলা বৈশাখ বা জব্বারের বলিখেলা—এ ধরনের উৎসবগুলো এদেশের মানুষের চিরায়ত উৎসব; সম্মিলিত উদযাপনের স্মারক। ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে এসব উৎসবের মহত্ত্ব। ধর্মীয় উৎসবগুলো বিধিশাসিত ও কাঠামোবদ্ধ, কিন্তু যেকোনো চিরায়ত উৎসব সর্বজনীন ও অবারিত। যারা এসব চিরায়ত উৎসব বন্ধ করতে চায়, তারা মূলত সর্বজনীনতা অস্বীকার করে সীমিত গণ্ডির উৎসবের কথা ভাবেন। তারা সমাজ ও ধর্ম গুলিয়ে ফেলেন।


ধর্মের আধ্যাত্মিক দিকের চেয়ে আচারসর্বস্বতা তাদের কাছে অগ্রগণ্য।


‘ধৃ’ ধাতু থেকে 'ধর্ম' শব্দের উৎপত্তি। ‘ধৃ’ ধাতুর অর্থ ‘ধারণ করা’, ‘পোষণ করা’ বা ‘রক্ষা করা’। শাব্দিক অর্থে ধর্ম হলো তা-ই, যা সমাজ, জীবন ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করে, টিকিয়ে রাখে এবং যার মাধ্যমে মানবকল্যাণ ও মানুষের সুরক্ষা সাধিত হয়। অন্তর দিয়ে ধারণ করতে না পারলে ধর্মীয় মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখা কঠিন। ‘তৌহিদী জনতা’র কর্মকাণ্ড আচারনিষ্ঠ হলেও সেখানে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা অনুপস্থিত। তা যদি না হতো, তাহলে ইরান ছাড়াও আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সাড়ম্বরে নববর্ষ হিসেবে ‘নওরোজ’ উদযাপিত হতো না; নওরোজ উৎসব বন্ধ হয়ে যেত। ধর্মীয় বিষয়ে আক্ষরিক ব্যাখ্যার চেয়ে আধ্যাত্মিক বা উদার ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা এখন দারুণভাবে অনুভূত হচ্ছে।


আনন্দ বা উচ্ছ্বাসের মতো বিষয়কে যারা অস্বীকার করতে চান, তাদের কাছে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি পরিচিত নয়। একই গ্রন্থে হুমায়ুন আজাদ আরও লিখছেন, ‘‘আনন্দ যাদের কাছে পাপ, জীবন তাদের কাছে সুখের হতে পারে না।।’’ জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠির মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিষয় ঘিরে নতুন বয়ান তৈরি করা ও তা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাজারে হামলা, ওরশে বাধা, কনসার্ট আয়োজনে প্রতিবন্ধকতার খবর প্রতিনিয়ত শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা কুহেলিকাময়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও