বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু: এখনও যে প্রশ্নগুলোর উত্তর নেই
বছর ঘুরে আবার অগাস্ট এসেছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আরেকটি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের পরিবারের কাছে এই এক বছর কোনো সাধারণ সময়ের হিসাব নয়। এটি এক দীর্ঘ অপেক্ষা। এক বছরের নীরবতা। একগুচ্ছ উত্তরহীন প্রশ্ন। আর এমন এক শূন্যতা, যার কোনো পরিমাপ হয় না।
আমার দাদা, সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার, আমাদের সবার প্রিয় বিভুদা, পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার এক বছর পূর্ণ হলো। সময় চলে গেছে, কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে থাকা প্রশ্নগুলো যায়নি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, কিছু প্রশ্ন ততই স্পষ্ট হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তার মৃত্যু আসলে কীভাবে ঘটেছিল?
একজন মানুষের মৃত্যু ব্যক্তিগত শোকের বিষয় হতে পারে। কিন্তু একজন সত্তরোর্ধ্ব বয়সী সাংবাদিকের মৃত্যু, বিশেষ করে মৃত্যুর আগে যিনি চাপ, অপমান, হুমকি ও নানা অস্বস্তিকর ঘটনার কথা লিখে গেছেন, সেটি শুধু পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকতে পারে না। সেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে, সাংবাদিক সমাজের দায়িত্ব আছে, গণমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব আছে।
বিভুদার মৃত্যুর পর পুলিশ বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছিল। কিন্তু ৩৬৫ দিন পেরিয়ে গেলেও সেই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে পরিবার কার্যত অন্ধকারে। তার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও পরিবারের হাতে পৌঁছায়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, জানতে চাওয়া হয়েছে, কিন্তু উত্তর মেলেনি। কখনো নীরবতা, কখনো অজুহাত, কখনো এড়িয়ে যাওয়া। ইউনূস সরকারের প্রশাসন, পুলিশ, কারো কাছে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
একটি মৃত্যুর তদন্তে এত দীর্ঘ নীরবতা কি স্বাভাবিক?
আমরা জানি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় মামলা হওয়া আর ন্যায়বিচার পাওয়া এক কথা নয়। কাগজে তদন্ত থাকে, ফাইলে নথি থাকে, দপ্তরে দায়িত্ব থাকে। কিন্তু সত্যের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা এমনভাবে জটিল হয়ে ওঠে যে ভুক্তভোগীর পরিবার শেষ পর্যন্ত শুধু অপেক্ষাই করতে থাকে। আমরাও অপেক্ষা করছি।
কিন্তু শুধু পরিবারের অপেক্ষা যথেষ্ট নয়। কারণ বিভুদা শুধু আমাদের পরিবারের সদস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি পরিচিত নাম। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামনিস্ট এবং দীর্ঘ সাংবাদিকজীবনের একজন সক্রিয় কর্মী। তার কলমে দেশের রাজনীতি, ক্ষমতা, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার নিয়ে বহু কথা উঠে এসেছে। অথচ তার মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়েছে, তা হলো নীরবতা।
দেশের কোনো বড় সংবাদমাধ্যমে তার মৃত্যুর পর পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমরা দেখিনি। কোনো টেলিভিশন তার শেষ দিনগুলো নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধান করেনি। তার মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তার নিজের লেখা শেষ চিঠিতে কী কী ইঙ্গিত ছিল, সেসব নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানও হয়নি।
এখানেই প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে ওঠে। সাংবাদিকেরা যদি একজন সাংবাদিকের মৃত্যুর প্রশ্নও অনুসরণ না করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অর্থ কী?
বিভুদার মৃত্যুর আগে লেখা খোলা চিঠিটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। চিঠিটি কোনো সরল আত্মপক্ষসমর্থনের লেখা নয়। সেখানে তিনি নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা, চাপ, অপমান ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। কিছু নাম, কিছু ঘটনার সময়ক্রম, কিছু ইঙ্গিত তিনি রেখে গেছেন।
তিনি সরাসরি কাউকে অভিযুক্ত করেননি। কিন্তু একজন সাংবাদিকের শেষ লেখা যখন এত প্রশ্নের জন্ম দেয়, তখন সেই প্রশ্নগুলো যাচাই করা কি সাংবাদিক সমাজের দায়িত্ব নয়?
চিঠিটি কি সত্য? সেখানে বর্ণিত ঘটনাগুলো কতটা সত্য? কারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন? কোনো চাপ সত্যিই ছিল কি না? থাকলে তার উৎস কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। আর এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় হতাশা।
কারণ বিভুদা সারাজীবন অন্যের প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। অথচ তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টিই যেন প্রশ্নহীনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত কোথায়, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। জীবনে মাত্র একবার তিনি সাংবাদিক হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই সফরকে কেন্দ্র করে তিনি নানা চাপ ও হয়রানির মুখে পড়েছিলেন। মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রেস উইং নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ এবং প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
এরপর আসে ১৫ অগাস্টের ঘটনা। ‘আজকের পত্রিকা’ কার্যালয়ে একটি লেখা প্রকাশকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস উইংয়ের এক বড় কর্তা বিভুদাকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশ কার্যকর না হলে পত্রিকার ওপর চাপ এবং বিভুদাকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়েছিল বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত বা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু অভিযোগ যখন একজন সাংবাদিকের জীবনের শেষ কয়েক দিনের সঙ্গে যুক্ত, তখন তা তদন্তের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।
বিভুদাকে শেষ পর্যন্ত অফিস ছাড়তে হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে কয়েক দিনের ছুটিতে যেতে বলা হয়েছিল বলে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেটি কি সত্যিই নিছক ছুটির ঘটনা ছিল?
১৭ অগাস্ট তার কাছে একটি ভয়াবহ হুমকিবার্তা পৌঁছেছিল বলে তার এক সহকর্মী জানিয়েছেন। সেখানে সব দায় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছিল এবং অন্যথায় মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ১৭ থেকে ১৯ অগাস্ট পর্যন্ত তিনি ভয়, চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন বলেও জানা যায়। তারপর তার মৃত্যু। এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিই তো তদন্তের বিষয়।
আমরা কাউকে অপরাধী ঘোষণা করছি না। আমরা কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষমতাও রাখি না। আমরা শুধু জানতে চাই, কী ঘটেছিল?
এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব পরিবারের নয়, শুধু পুলিশেরও নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কারণ একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা কেবল একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়। সাংবাদিকের নিরাপত্তা আসলে সমাজের জানার অধিকার রক্ষার একটি অংশ।