এ জাতিকে লইয়া আমরা কী করিব
পৃথিবী খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে। আল্লাহর দুনিয়া মানুষ তাদের ইচ্ছা ও শক্তির জোরে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। যার যত বেশি ক্ষমতা, সে তত বেশি ছড়ি ঘোরায়। এর মধ্য থেকেই উঠে এসেছে নানান তত্ত্ব। তার মধ্যে একটি হলো ‘জাতীয়তাবাদ’। এই তত্ত্বের জোরে রাষ্ট্র তৈরি হয়, টিকে থাকে কিংবা ভাঙে।
জাতীয়তাবাদ হলো একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা, যেখানে জাতি ও তার পরিচয়কে সমাজের কেন্দ্রীয় অবস্থানে রাখা হয়। এটি মানুষকে এককাট্টা করতে পারে, আবার উগ্র রূপে বিভেদও তৈরি করতে পারে। জাতীয়তাবাদ আসলে কী? এটি একটি বিশ্বাস বা মতবাদ, যা বলে দেয় যে জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা উচিত। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের জনগণ একটি নির্দিষ্ট জাতি বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বসবাস করবে।
ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান মূলত ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়ন যুগে। সেখানে জনগণের আত্মপরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। এটি জার্মানি ও ইতালির মতো দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে আবার অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো বহুজাতিক সাম্রাজ্যকে ভেঙে দিয়েছে।
ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে আর বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতাসংগ্রামে ঐক্য এনেছে। উভয়ের মিল হলো জাতীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রের ভিত্তি করা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। প্রকৃতপক্ষে ইউরোপ আর বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য সামান্যই। উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দেখা গেছে।
বাঙালির জাতিভাবনার উন্মেষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। সাহিত্যে আমরা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় এর প্রতিফলন দেখি। বঙ্কিমচন্দ্রের চোখে দেশ হচ্ছে মা। এখানে তিনি বাংলা আর ভারতকে এক করে দেখেছেন। তাঁর জাতীয়তাবাদে ছিল দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তি, ত্যাগ ও শক্তির সমন্বয়। তাঁর উপন্যাস আনন্দমঠ এবং গান ‘বন্দে মাতরম’ ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি দিয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। তবে অনেকেই মনে করেন, বঙ্কিমের জাতীয়তাবাদ ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদ।
বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখে জাতীয়তাবাদ ছিল এক গভীর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে সংকীর্ণ জাত্যভিমানকে তিনি প্রত্যাখ্যান করে জাতীয়তাবাদকে সর্বজনীন মানবতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয়তাবাদ যদি অন্য জাতিকে বাদ দেয় বা ঘৃণা তৈরি করে, তবে তা মানবতার পরিপন্থী। তাঁর মতে, উগ্র জাতীয়তাবাদ মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে বন্দী করে ফেলে।
আমরা যে অর্থে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলি, তার শুরুটা আসলে ভারতভাগের পর। একদা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জন্ম নিয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ। তার ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম। তবে এটি বেশি দিন অখণ্ড রাখা যায়নি।
জাতীয়তাবাদী ধারণা তৈরি ও এটি নিয়ে আন্দোলন করতে প্রতিপক্ষ লাগে। এর অনুষঙ্গ হলো ঘৃণা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পশ্চিমের বিরুদ্ধে পুবের মানুষের বৈষম্যের অভিযোগ ও ক্ষোভ থেকেই এর জন্ম। আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা, ভাত আর রুটি একসঙ্গে যায় না—এসব স্লোগান পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একধরনের মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছিল। এর প্রতিফলন ছিল রাজনীতিতে। পাকিস্তানি শাসন মানে বিদেশি শাসন, বাঙালির শত্রু হলো অবাঙালি, বাঙালির আলাদা রাষ্ট্র চাই। তবে এটি নিছক একটি রাজনৈতিক মতবাদ ছিল না। এর সঙ্গে ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা।
শুরুটা ১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলন দিয়ে। সেটি শেষ হলো ১৯৭১ সালে সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধের মাধ্যমে। এ পর্বের পুরো সময়ে তিনটি স্লোগান এ অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী ধারণাকে সিঞ্চিত ও উজ্জীবিত করেছিল। প্রথমটি হলো—তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। অর্থাৎ পদ্মা-মেঘনা-যমুনাবিধৌত অঞ্চলটি আমাদের আসল ঠিকানা, আমাদের কাঙ্ক্ষিত দেশ। দ্বিতীয় স্লোগানটি ছিল—তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি। এর অর্থ, আমাদের পরিচিতি হবে বাঙালি হিসেবে, যেখানে অবাঙালির ঠাঁই নেই। তৃতীয় স্লোগানটি ছিল—জয় বাংলা। এই স্লোগানে বাঙালির একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল। সব কটি ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে। অবাঙালিদের একটা বড় অংশ ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে ঠাঁই নিয়েছে জেনেভা ক্যাম্পে। তারপরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়—জাতীয়তাবাদ প্রশ্নটির কি মীমাংসা হয়েছে? বাংলাদেশ কি বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র হতে পেরেছে?
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান নামে যে ভৌগোলিক অঞ্চলটি ছিল, সেটি বাংলাদেশ হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে আমাদের জাতি পরিচিতি হিসেবে বলা হয়েছে—আমরা বাঙালি। বাংলাদেশ কি সব বাঙালির রাষ্ট্র? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বাইরে তো আরও কোটি কোটি বাংলাভাষী আছে, যারা অন্যান্য রাষ্ট্রের নাগরিক। তাহলে এখানে ‘বাঙালি’ জাতি পরিচিতির ভিত্তি কী? এখানে ভাষা তো আছেই, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভূগোল। অর্থাৎ বাংলাদেশ বাঙালি জাতির (বাংলাভাষী অর্থে) রাষ্ট্র নয়; বরং পাকিস্তানের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের কর্তাদের মধ্যে হয়তো একধরনের বিভ্রান্তি কাজ করেছিল। সংবিধানে বাঙালি পরিচয় ঢুকিয়ে দিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পাসপোর্টে জাতীয়তার (ন্যাশনালিটি) জায়গায় লেখা হতো ‘সিটিজেন অব বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশের নাগরিক)। এ থেকে একটা অর্থ বের করে নেওয়া যায় যে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কাছে ভাষাভিত্তিক পরিচয় গৌণ। একজন বলতেই পারেন, আমি জাতিতে বাঙালি। তবে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমি ‘বাংলাদেশি’।
১৯৭৫ সালের রাজনীতির পালাবদলের পর আমরা পরিবর্তন দেখলাম। জাতীয় পরিচয় হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে তৈরি হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। প্রথমটি ভাষাভিত্তিক, দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়।
ক্রমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শে জাতীয়তাবাদ দুটি ভিন্ন রূপ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার হিসেবে ধরে রেখেছে আর বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তি করেছে। উভয় জাতীয়তাবাদই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। তবে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের একটি বড় কারণ। এই দ্বন্দ্ব শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অনেকটাই রাজনৈতিক, যা রাষ্ট্রীয় নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আওয়ামী লীগ ও তার সমমনাদের চোখে শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ‘জাতির পিতা’। এটি তাদের কথা ও লেখায় অহরহ উচ্চারিত হয়। প্রশ্ন হলো, তিনি কোন ‘জাতি’র পিতা? বাংলাদেশ তো সব বাঙালির রাষ্ট্র নয়? তাঁকে জাতির পিতা মানতে হলে বলতে হবে তিনি এই ‘বাংলাদেশি জাতির পিতা’।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ধারণা
- বাঙালি
- রাজনৈতিক
- জাতীয়তাবাদ
- সাংস্কৃতিক