পিংক বাস, এখানে একটা ‘কিন্তু’ আছে
ধরি, একজন কর্মজীবী নারী সকাল আটটায় বাসস্টপে এসে জানলেন, মেয়েদের জন্য নির্ধারিত ‘পিংক বাস’টি আসবে সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে। তার অফিস শুরু নয়টায়। তিনি কী করবেন? নিরাপত্তার আশায় ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করবেন, নাকি সামনে আসা অন্য বাসটিতে উঠে সময়মতো অফিসে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন? ঢাকায় নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে সম্ভবত এই সাধারণ প্রশ্নটিই থাকা উচিত।
নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার সরকারি উদ্যোগ হিসেবে, ১৮ আগস্ট ২০২৬ থেকে বিআরটিসি নতুন করে বিশেষ মহিলা বাসসেবা চালু করেছে। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে প্রাথমিকভাবে ১০টি বাস পরিচালনার কথা বলা হয়েছে; চালক ও কন্ডাক্টরও নারী। এটা সত্য যে, নারীদের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ‘পিংক বাস সার্ভিস’-শুধু একটি পরিবহন উদ্যোগ নয়, নারীর নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও যুক্ত একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার।
এ উদ্যোগের পেছনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ নেই। ২০২৬ সালে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-এর একটি জরিপে প্রায় এক হাজার কর্মজীবী নারীর যাতায়াত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৬ শতাংশ নারী এখনো নন-এসি সিটি বাস এবং ১৭ শতাংশ লেগুনা বা টেম্পোর ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ মেট্রোরেল চালু হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীর দৈনন্দিন যাতায়াত সড়কভিত্তিক গণপরিবহননির্ভর।
একই গবেষণায় দেখা যায়, নারীরা আয়ের প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশ পরিবহনে ব্যয় করেন। ফলে নিরাপত্তার পাশাপাশি সামর্থ্যের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর নিরাপত্তার বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি-এর গবেষণায় ঢাকার প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী গণপরিবহন ব্যবহারকারী যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন; প্রায় প্রতি ছয়জনের একজন দৈনিক এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। ফলে পিংক বাসের প্রয়োজনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
এখানেই একটা ‘বড় কিন্তু’ আছে
ঢাকায় নারীদের জন্য বাস বা মহিলা বাস এই ধারণা নতুন নয়। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, বিআরটিসি আশির দশকের শুরুতেই নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু করেছিল। পরে ১৯৯৭, ১৯৯৮, ২০০১, ২০০৪ এবং ২০০৮ সালেও বিভিন্নভাবে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০০৪ সালে ২২টি বাস চালু হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একপর্যায়ে তা ১১টিতে নেমে আসে। অর্থাৎ আমরা এমন একটি উদ্যোগ আবার শুরু করছি, যার অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রয়েছে। তাই এবার সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে আগের ব্যর্থতা থেকে শেখা।
২০০৯ সালে নারীদের জন্য বাস বা মহিলা বাস ব্যবহারকারী নারীদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় ৯৫ শতাংশ যাত্রী বলেছিলেন, বাসের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। ৬০ শতাংশের প্রধান চাওয়া ছিল আরও বাস, বেশি ফ্রিকোয়েন্সি এবং কম ওয়েটিং টাইম।
গবেষণায় আরও উঠে আসে, কম রুট কাভারেজ, নির্দিষ্ট সময় না থাকা, দুর্বল বাসের অবস্থা এবং সেবা সম্পর্কে তথ্যের অভাব। এমনকি অনেক নারী সেবাটির সময়সূচি ও স্টপেজ সম্পর্কেই জানতেন না।
অতীতের সেবা বন্ধ হওয়ার পেছনে কম যাত্রী ও আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হলেও গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তুলেছিল—সেবা যদি প্রয়োজনের সময় ও প্রয়োজনের জায়গায় না থাকে, তাহলে যাত্রী আসবে কীভাবে? এই প্রশ্নটি ২০২৬ সালেও সমান প্রাসঙ্গিক।
বর্তমান পরিকল্পনায় মাত্র ১০টি বাস দিয়ে ঢাকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট কভার করার কথা বলা হয়েছে। এই সীমিত সম্পদ দিয়ে যদি একটি রুটে বড় ধরনের উন্নতি হয়ও তাহলে একজন যাত্রীকে অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট বা তার বেশি অপেক্ষা করতে হতে পারে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মহিলা বাস সর্ভিস