‘ছুটি, প্রভু, ছুটি’
না, ওঁকে আর দেখব না। দেখব না ওঁর আয়ত গভীর চোখ, ওঁর চিবুকের গভীর টোল। শুনব না ওর শান্ত স্বরের কথা, ওঁর গভীর অভিনিবেশে অন্যের কথা। এ সবই ওঁর অবয়ব ও চরিত্রের অংশ। কিন্তু আমি জানি, প্রয়াত বিভুরঞ্জন সরকার এ সবকিছুকে ছাড়িয়ে আরও বড় ব্যাপ্ত এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। আমার তো জানবারই কথা। কারণ, বিভুকে তো আমি চিনতাম অর্ধশতাব্দী সময় কালের ওপরে।
বিভুকে আমি প্রথম দেখেছি সত্তরের দশকে। যখন ওঁর যৌবনকাল। দেখা হয়েছে জগন্নাথ হলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর ও মধুর ক্যানটিনে। বিভু তখন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। মধুর ক্যানটিনে আমার কবিবন্ধু প্রয়াত মাসুদ আহমেদ মাসুদ বিভুর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। শান্ত, মৃদুভাষী ও যুক্তিবাদী বিভুকে প্রথম দেখাতেই আমার ভালো লেগেছিল। ওঁকে আমার দৃঢ়চেতা এক সজ্জন মানুষ বলে মনে হয়েছিল। প্রথম দর্শনেই ওঁ উচ্চকিত ছিল আমার বিদ্যায়তনিক অর্জন, লেখা ও বিতার্কিক হিসেবে। বলা বাহুল্য, আমি খুব বিব্রত বোধ করেছিলাম।
সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি উচ্চশিক্ষার্থে দেশের বাইরে চলে যাই। বিভুর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হঠাৎ করে বিভুর সঙ্গে সংযোগ আবার পুনঃস্থাপিত হয় আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি উচ্চশিক্ষা সমাপনান্তে ঢাকায় ফিরে এলে। একদিন বিভু এসে হাজির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে আমার কক্ষে। খুলনার এম ইউ আহমেদের ঢাকার বাসায় এক সম্মিলনীর আয়োজন করেছে বিভুরঞ্জন সরকার। সেখানে সে আমন্ত্রণ করেছে আমাকে। সে সম্মিলনীতে ছিলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, আহমেদুল কবির ও বিভু। অসম বয়সের একদল মানুষকে নিয়ে অনির্বচনীয় এক আড্ডা জমে উঠেছিল সেদিন। পরে বহুবার বিভু ওই আড্ডার কথা বলত।
তত দিনে বিভু একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক ও কলাম লেখক। ‘যায়যায়দিনে’ ওঁ লিখছে ‘তারিখ ইব্রাহীম’ ছদ্মনামে। আমরা পাঠকেরা উদগ্রীব হয়ে ওঁর লেখাগুলো পড়ছি নানা পত্র-পত্রিকায়। তীক্ষ্ণ যুক্তির বাহুল্যহীন লেখাগুলো নজর কাড়ছে নানান জনের আর গোষ্ঠীর। নন্দিত যেমন হচ্ছে ওঁ, তেমনি শত্রুসংখ্যাও বাড়ছে। কারণ ওঁর লেখাতে সে আপসহীন; যা ওঁর সত্যি বা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে তাই সে লিখছে। নানান রাজনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছে বিভু। কিন্তু সর্বত্রই ওঁর কলম, কণ্ঠ ন্যায় ও সত্যের পক্ষে।
সেই সঙ্গে খবর পাচ্ছি বিভু সম্পাদনার দায়িত্ব নিচ্ছে নানান পত্র-পত্রিকার। কিন্তু নানান বিষয়ে ওঁর ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান আদৃত হচ্ছে না পত্রিকা মালিকদের দ্বারা। তাই সে সরে যাচ্ছে এক সংবাদপত্র থেকে অন্য সংবাদপত্রে। নানান সংবাদপত্র মালিক এবং তথাকথিত সংবাদপত্রশিল্পে বিনিয়োগকারীদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে বিভু। ঠকিয়েছে তারা ওঁকে। এ প্রক্রিয়ায় বিভুর অর্থক্ষয় হয়েছে, ঋণগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরে এসব কথা সে আমাকে বলেছে। কিন্তু খুব আশ্চর্য যে, কারও বিরুদ্ধে সে অভিযোগ করেনি।
বিভুকে আমি সব সময় বলতাম ‘ভদ্রলোক সাংবাদিক’। সাংবাদিকতার নীতিমালাগুলো বিভু মেনে চলত। সেসব মূল্যবোধ থেকে সে কখনো বিচ্যুত হয়নি, ওঁর পরম কষ্টের সময়েও। বিভুরঞ্জন সরকার কারও কাছে বিক্রি হয়নি, কাউকে সে কিনতেও চায়নি। আমাদের দেশের বর্তমান সাংবাদিকতার বলয়ে এ এক বিরল গুণ, যে গুণ বিভুর ছিল ওঁর চারিত্রিক স্বাভাবিকতায়—যাকে ওঁ পরিশীলিত করেছিল ওঁর নৈতিক দার্ঢ়্যতায়।
সেসব কারণে বিভুকে নানান সময়ে নানান কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়েছে। তার বহু কিছুই আমি জানি। কিছু কিছু ওঁ আমাকে মুখ ফুটে বলেছে, কিছু কিছু আমি আন্দাজ করে নিয়েছি। ওঁর নানান যাতনা, দুশ্চিন্তা, হতাশা আর অসহায়ত্বের কথা নানান সময়ে আমাকে বলেছে। বিভিন্ন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছি ওঁর, যতটা পেরেছি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছি। কিন্তু তার পরেও বহু কিছু ছিল, যা ছিল আমার সাধ্যের বাইরে। তাই অনেক সময়ে অসহায় বোধ করেছি।
কত বার্তালাপ যে হয়েছে আমাদের দুজনের মধ্যে—মুঠোফোনের মাধ্যমে, তথ্যপ্রযুক্তির বার্তায় এবং সাম্প্রতিক সময়ে ই-মেইলের মাধ্যমে। যোগাযোগ হয়েছে ওঁর দপ্তর থেকে, কখনো কখনো যখন সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বিভু রমনা উদ্যানে প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়েছে। কত শত বার্তা যে চালাচালি হয়েছে আমাদের মধ্যে লেখা চেয়ে, লেখার তাগাদা দিয়ে, কোন কোন বিষয়ে যে আমার লেখা অপরিহার্য তা জানিয়ে, আমার লেখার প্রশংসা করে। আমার লেখা পেলেই বিভু সেটা ছাপিয়েছে নানান প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে—বিষয়ের স্পর্শকাতরতা, রাজনৈতিক কারণে। সেই সঙ্গে নানান সময়ে তাঁর সন্তানদের সাফল্যের সংবাদ সহভাগ করে নিয়েছে। তখন এক গর্বিত পিতার অবয়ব আমি দেখেছি।