হামিদুর রহমানের ভাঙা ভাস্কর্য: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় দায় কার?

বিডি নিউজ ২৪ শাহেদ কায়েস প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২০:৩৫

একটি ভাস্কর্য ভাঙলে কতটুকু ভাঙে? ইট, পাথর, ধাতু কিংবা নির্মাণ শৈলীর দৃশ্যমান অবয়বটুকু? ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ভাঙচুর হওয়া ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়ালে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে। কারণ আঘাত করা হয়েছে এমন একজন মানুষের স্মৃতির প্রতি, যিনি একাত্তরে নিজের জীবন দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বরের ভাস্কর্য ভাঙা শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর মুক্তিযোদ্ধা, হামিদুর রহমানের পরিবার, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভও হয়েছে। পরে ঢাকা থেকে নাগরিক সমাজের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে যায়। তারা ভাঙা ভাস্কর্য পরিদর্শন করে, শ্রদ্ধা জানায় এবং পুনঃস্থাপনের দাবি তোলে।


ঘটনাটিকে শুধু একটি স্থাপনা ভাঙার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা ধরা পড়বে না। প্রশ্ন উঠবে, স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া একজন বীরের স্মৃতিচিহ্ন কেন আক্রান্ত হলো? কারা ভাঙল? কী উদ্দেশ্যে ভাঙল? প্রশাসন তখন কোথায় ছিল? ভাঙচুরের খবর প্রকাশ্যে আসার পরও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন কেন নাগরিকদেরই তুলতে হচ্ছে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জানা জরুরি।


বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিচয় কোনো রাজনৈতিক দলের দলীয় বৃত্তে আটকে নেই। তিনি বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় ধলই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান দখলের অভিযানে তিনি জীবন দেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। স্বাধীনতার জন্য সেই আত্মদান তাকে বাংলাদেশের মানুষের যৌথ স্মৃতির অংশ করে রেখেছে। সুতরাং তার ভাস্কর্যের ওপর আঘাতের তাৎপর্যও বৃহত্তর।


একটি সমাজ তার অতীতকে কীভাবে ধারণ করে, তা বোঝা যায় সেই সমাজের স্মৃতিচিহ্নগুলোর প্রতি আচরণ দেখে। শহরের কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্য শুধু সৌন্দর্য বর্ধনের উপকরণ হয়ে থাকে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষ, ঘটনা, সময় এবং একটি জনগোষ্ঠির দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতি। নতুন প্রজন্ম সেই দৃশ্যমান স্মারকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে পারে, মানুষটি কে ছিলেন? কেন তার ভাস্কর্য এখানে? কী করেছিলেন তিনি? সেই প্রশ্ন থেকেই অতীতের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ তৈরি হয়। ফলে ভাস্কর্য ধ্বংসের মধ্য দিয়ে স্মৃতির সেই দৃশ্যমান সংযোগেও আঘাত আসে। আরও উদ্বেগের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ভাস্কর্য ও স্থাপনার ওপর আক্রমণের একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ঝিনাইদহের কর্মসূচিতে মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক আবু সাইদ খান মেহেরপুরের মুজিবনগরে ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে প্রতিটি আক্রমণকে পাশ কাটিয়ে গেলে সামগ্রিক প্রবণতাটি চোখ এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এখানে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ খুব সামান্য।


নাগরিক প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ চত্বরে স্থাপিত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও প্রশাসনের নজরে কেন বিষয়টি এল না। তাঁদের বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, জনপরিসরে থাকা জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বর্তায়। ভাস্কর্যটি কে বা কারা ভেঙেছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বের করা দরকার। অনুমান, গুজব কিংবা রাজনৈতিক সুবিধামতো কোনো গোষ্ঠিকে অভিযুক্ত করার বদলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে তথ্য ও তদন্তের মাধ্যমে। সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে তা সংগ্রহ করা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া, স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করা এবং ভাঙচুরের সময়কার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে দেখতে হবে, প্রশাসনিক অবহেলা কিংবা কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয় ছিল কি না।


দায়ীদের বিচারের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো স্মারক ভেঙে ফেলার পর নতুন করে নির্মাণ করলেই পুরো ঘটনার সমাপ্তি ঘটে না। অপরাধের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলায় অন্যরাও উৎসাহিত হতে পারে। আজ হামিদুর রহমান, আগামীকাল অন্য কোনো মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ কিংবা ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক আক্রান্ত হতে পারে। এক সময় জনপরিসর থেকে একাত্তরের দৃশ্যমান স্মৃতিগুলো ক্রমে মুছে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে। এখানে আরেকটি বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার। বাংলাদেশে ভাস্কর্যকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। শিল্প হিসেবে ভাস্কর্য, স্মৃতির বাহক হিসেবে ভাস্কর্য এবং উপাসনার প্রতিমার মধ্যকার পার্থক্য ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। সেই বিভ্রান্তি যখন সংগঠিত বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন শিল্পকর্মের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের দৃশ্যমান সম্পর্ক।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও