সবুজ রেনেসাঁ এবং আগামীর বাংলাদেশ
বাংলাদেশ নামের এ বদ্বীপের প্রতিটি ধূলিকণায় সবুজের অস্তিত্ব রয়েছে। এই সবুজের নিজস্ব ভাষাও আছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আমরা সেই ভাষা বুঝতে ভুল করেছি; প্রকৃতিকে দেখেছি কেবল উন্নয়নের প্রতিপক্ষ বা ভোগের সামগ্রী হিসাবে। এতে ক্ষতি হয়েছে ভয়াবহ মাত্রায়। এই ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়ে আমাদের আগের অবস্থানে যেতে দরকার ‘সবুজ রেনেসাঁ’ বা নতুন ধারার জাগরণ। উন্নয়নও থাকবে, প্রকৃতিও থাকবে। দুটি নিয়েই আমাদের চলতে হবে। এবং তা হতে হবে সংবেদনশীলতা নিয়েই। বর্তমান সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, দেশ ওই দিকেই যাত্রা শুরু করেছে।
অরণ্যের সুর ও শেকড়ের টান : আমাদের বৃক্ষরোপণ কিংবা বনায়ন কর্মসূচিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি প্রজাতির গাছের ‘মনোকালচার’ বা একঘেয়েমিতে বন্দি ছিল। মেহগনি বা আকাশমণির মতো দ্রুতবর্ধনশীল গাছের মোহে আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের মাটির নিজস্ব সুর। অথচ, বন মানে কেবল কাঠ নয়, বন মানে বাস্তুতন্ত্রের প্রাণ। অবশ্য এই অবস্থা বদলাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে মহোদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এই ২৫ কোটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি ‘মাদার ট্রি’ বা মাতৃগাছ সংরক্ষণের মাধ্যমে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বনজ ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও আছে এতে। বৃক্ষরোপণে কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। অবকাঠামো গড়তেই হবে। এগুলো ছাড়া আমাদের চলবে না। তবে অবকাঠামো যাতে প্রকৃতিকে গিলে না খায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো ও প্রকৃতি হবে পারস্পরিক সহযোগী, কোনোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না।
নগরীর ফুসফুস ও প্রযুক্তির ছোঁয়া : ঢাকার মতো ইটপাথরের জঞ্জালে বন্দি শহরে আমরা শ্বাস নিতেই ভুলে গেছি। এখানে কেবল গাছ কেটেই সর্বনাশ করা হয়নি, সেই সাথে ইট-পাথরের বস্তি বানিয়ে ফেলা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে ফিটনেসহীন যানবাহনের কারণে। দূষণ সৃষ্টিকারী গাড়িগুলো অপসারণ এবং বায়ুমণ্ডলের অতি সূক্ষ্ম কণা পিএম ২.৫ এবং পিএম১০ নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগটি প্রশংসার দাবি রাখে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবেশের ওপর নজরদারি করার যে সিদ্ধান্ত সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে, তা আমাদের নগর প্রশাসনকে একুশ শতকের আধুনিকতায় উন্নীত করবে। গুলশান, বনানী বা বারিধারার লেক পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাটি কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বরং শহরের ‘ফুসফুস’ সচল রাখার এক সাহসী পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে, এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে। আর রাষ্ট্র যখন প্রকৃতিকে সম্মান করতে শেখে, তখনই প্রকৃত অর্থেই একটি জাতি সভ্যতার শিখরে আরোহণ করে।
প্রকৃতিভিত্তিক আগামীর রূপরেখা : বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিবেশবিষয়ক অবস্থান সমুন্নত রাখার জন্য একটি কাঠামোগত রূপরেখা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এর মূল ভিত্তি হলো-১. এসডিজি বাস্তবায়ন : জলবায়ু কার্যক্রম (এসডিজি ১৩), স্থলভাগের জীবন (এসডিজি ১৫) এবং বিশুদ্ধ পানির (এসডিজি ৬) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা। ২. এইচসিভি ফ্রেমওয়ার্ক : প্রতিটি বড় প্রকল্পে ‘হাই কনজারভেশন ভ্যালু’ (এইচসিভি) মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, যাতে বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর করিডর অক্ষত থাকে। ৩. নদী পুনরুদ্ধার : পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও বুড়িগঙ্গার মতো প্রধান নদীগুলোকে শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিকমুক্ত করা, যা নদীনির্ভর মানুষের জীবন ও জীববৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনবে। ৪. প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান (এনবিএস) : নদীভাঙন ও নগর তাপের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাস্তুতন্ত্রকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা।
নীল অর্থনীতির দিগন্ত : সমৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা : আমাদের উন্নয়নের দিগন্ত কেবল স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ নয়; বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি আমাদের অর্থনীতির ‘নীল খনি’। নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো সমুদ্রকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ঐশ্বর্যের চূড়ায় উঠেছে, তা আমাদের জন্য এক ধ্রুপদি শিক্ষা। বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতি জিডিপিতে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। একে পরবর্তী পাঁচ বছরে ১০ শতাংশে উন্নীত করা যেতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী ‘ব্লু হরাইজন’ কৌশল। আর সেজন্য গ্রহণ করতে হবে নির্ভুল বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ : ব্লু ইকোনমি অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল, বিশেষজ্ঞ সমুদ্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে নীতিনির্ধারণ। অবকাঠামো ও প্রযুক্তি : মাতারবাড়ী ও চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রযুক্তিসমন্বিত বৈশ্বিক হাবে রূপান্তর। সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণ : অফশোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি (বায়ু ও জোয়ার-ভাটা), মেরিন বায়োটেকনোলজিতে বিনিয়োগ এবং গভীর সমুদ্রে টেকসই মৎস্যচাষ ও প্রক্রিয়াজাত সামুদ্রিক পণ্যের প্রসার। ব্লু বন্ড : উপকূলীয় পুনরুদ্ধার থেকে ইকো-ট্যুরিজম পর্যন্ত প্রকল্পগুলোয় বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক পুঁজি টানতে ‘ব্লু বন্ড’ প্রবর্তন।
আগামীর বাংলাদেশ : প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন : এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হবে ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের ঋণ শোধের চেষ্টা। এসডিজি বাস্তবায়ন, নদী ও জলাশয়গুলোকে শিল্পবর্জ্যমুক্ত করা এবং প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান গ্রহণ-এ প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের একটি ‘প্রকৃতিনির্ভর দেশ’ হিসাবে গড়ে তুলবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
- সামাজিক বনায়ন