চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা—গ্যাস সংকটে বিপন্ন বাংলাদেশ
সকালে রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না। দুপুরে পরিবারের খাবার তৈরি হয়নি। সন্ধ্যায়ও গ্যাসের চাপ এত কম যে চুলায় আগুন জ্বললেও রান্না করা যাচ্ছে না। রাজধানীর বহু পরিবারকে তাই বৈদ্যুতিক চুলা, এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে দৈনন্দিন জীবন চালাতে হচ্ছে। যে পরিবার মাসের শুরুতে গ্যাস বিল পরিশোধ করে, তাকে আবার বিকল্প জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। নাগরিকের কাছে এটি কোনো বিমূর্ত জ্বালানি-নীতির প্রশ্ন নয়; এটি প্রতিদিনের রান্নাঘর, সংসার ও অর্থনীতির প্রশ্ন।
অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি। ভোরে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক চালক দিনের আয় হারাচ্ছেন। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমছে, কোনো কোনো কারখানা আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতও সরবরাহ-সংকটে পড়ছে। একটি জ্বালানি অবকাঠামোর কারিগরি ত্রুটি কীভাবে আবাসিক জীবন থেকে জাতীয় অর্থনীতি পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে, বর্তমান গ্যাস সংকট তারই বাস্তব উদাহরণ।
মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, কারিগরি সমস্যা দ্রুত সমাধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু সংকটের গভীরে গেলে দেখা যায়, সমস্যাটি শুধু একটি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নির্ভরতা এবং নীতিগত অসংগতিরও প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত—একটি টার্মিনাল অচল হলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা এতটা নড়বড়ে হয়ে পড়ে কেন? জ্বালানি নিরাপত্তার মৌলিক নীতি হলো বহুমুখী উৎস, পর্যাপ্ত মজুত ও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা। একটি উৎসে সমস্যা হলে অন্য উৎস সক্রিয় হবে। একটি অবকাঠামো অচল হলে বিকল্প অবকাঠামো সরবরাহ অব্যাহত রাখবে। সাময়িক সংকট যেন জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ না নেয়, সেটিই জ্বালানি পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো—দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে, নতুন অনুসন্ধান দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি অথচ চাহিদা বেড়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে।
এলএনজি আমদানি নিজে ভুল কোনো নীতি নয়। বিশ্বের বহু দেশই আমদানি করা গ্যাস ব্যবহার করে। সমস্যা হলো, বাংলাদেশে আমদানিনির্ভরতা যত বেড়েছে, সেই অনুপাতে সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা, গ্যাস মজুত সক্ষমতা এবং অবকাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা তৈরি হয়নি। ফলে আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেই তার প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্রিডে।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য বর্তমান সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে। তাদের হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ এফএসআরইউ মেরামত হলেও চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। সংকট তাই কেবল সাময়িক নয়; এর একটি কাঠামোগত চরিত্রও রয়েছে।
এখানেই রাষ্ট্রের জ্বালানি পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে। বছরের পর বছর আমরা জানি যে দেশীয় গ্যাসের মজুত সীমিত। আমরা জানি, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের সঙ্গে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে। আমরা জানি, সমুদ্রভিত্তিক টার্মিনাল ঝড় ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকে। আমরা জানি, আমদানিনির্ভরতার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি জড়িত। তারপরও কেন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও ঝুঁকি-সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি?
- ট্যাগ:
- মতামত
- গ্যাস সংকট