উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে ‘বাদাবনের বিজ্ঞান’
আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশের বনের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য। পাতাঝরা, জলাবন, কাশবন, পাহাড়ি বন, বৃষ্টিবন, গ্রামীণ বন, পাড়াবন, উপকূল বন কিংবা ম্যানগ্রোভ—কী নেই এ বদ্বীপে? উপকূলের খণ্ডবিখণ্ড ক্ষয়িষ্ণু কিছু টুকরো আর সৃজিত ম্যানগ্রোভ থাকলেও মূলধারায় বেশি আলোচিত ‘সুন্দরবন’।
সুন্দরবনসহ দেশের প্রতিটি ম্যানগ্রোভ বন বিপুল কার্বন শোষণ করে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে দাঁড়ায়। বহু স্থলজ ও জলজ প্রাণপ্রজাতির আবাস ও প্রজননস্থল। উপকূলের ১০ লাখ মানুষের জীবন–জীবিকা এই বনের ওপর নির্ভরশীল। বাংলা বাঘ, ইরাবতী ডলফিন, শ্বাসমূলীয় বৃক্ষ, বহু পাখি ও কুমিরের বিচরণস্থল।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হলেও এই বন নিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনগত অবস্থান অস্পষ্ট। বেশির ভাগ গবেষণা ও প্রকল্প সুন্দরবনকে দেখেছে ঔপনিবেশিক আয়নায়। এক খণ্ডিত বিচ্ছিন্ন বন্য প্রাণীর বাস্তুতন্ত্র হিসেবে। অন্যায়ভাবে ম্যানগ্রোভ ইতিহাসের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নির্দয় রক্তপাত ও নিখোঁজের খতিয়ান। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলগুলোকে কাঠামোগতভাবে খুন করে চলেছে।
- নোয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বহু এলাকায় এখনো কিছু খণ্ডবিখণ্ড ম্যানগ্রোভ বনের চিহ্ন আছে। গড়ে উঠেছে সৃজিত কিছু ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র।
- সুন্দরবনসহ দেশের সব ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের লোকায়ত জ্ঞান, লোকবিজ্ঞান, বনজীবীদের সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের দার্শনিক ও উৎপাদনমূলক প্রতিবেশগত সম্পর্ককে আমরা বুঝতে চাইনি।
- উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে সুন্দরবনসহ দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলোকে পাঠ করা জরুরি। বনজীবীদের লোকায়ত বিজ্ঞান ও দর্শন এ ক্ষেত্রে জাতীয় ম্যানগ্রোভ নীতি ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
শের ম্যানগ্রোভ জীবনব্যবস্থা নিয়ে আমাদের জানা–বোঝা প্রবলভাবে পরস্পরবিরোধী এবং খণ্ডিত। কারণ, বনজীবীদের বিচ্ছিন্ন ও আড়াল করে আমরা জোয়ার–ভাটার বনভূমির ব্যাকরণ বুঝতে চেয়েছি। সুন্দরবনসহ দেশের সব ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের লোকায়ত জ্ঞান, লোকবিজ্ঞান, বনজীবীদের সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের দার্শনিক ও উৎপাদনমূলক প্রতিবেশগত সম্পর্ককে আমরা বুঝতে চাইনি।
চার বিভাগে বিন্যস্ত সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দাঁড় করাই ‘বাদাবনের বিজ্ঞান’, প্রতিচিন্তা জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। ২০১০ সালে এই গবেষণার কিছু অংশ উপস্থাপনকালে বন বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা কপাল কুঁচকেছিলেন। মানুষ খায় এমন কোনো গাছের পাতা নেই সুন্দরবনে, এই বনের কিছু ফল কাঁচা খাওয়া গেলেও পাকলে খাওয়া যায় না, এক ফোঁটা মধুর জন্য একটি মৌমাছি ৮০টি ফুলে যায়—এসব তথ্য অনেকের প্রথম জানা হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর বন বিভাগ সুন্দরবন থেকে গোলপাতা আহরণ নিষিদ্ধ করে। প্রথাগতভাবে এই পাতা আহরণ না করলে শুকিয়ে মারা যায়। বনজীবীদের নিয়ে বহু দেনদরবারের পর বন বিভাগ বিজ্ঞানটি বুঝতে পেরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
নৃবিজ্ঞানী আন্নু জালাইসের ফরেস্ট অব টাইগারস: পিপল, পলিটিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ইন দ্য সুন্দরবনস বইটি প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। বাঘ ও বনের সঙ্গে বনজীবীদের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আলোচনার ভেতর দিয়ে লেখক সুন্দরবনের এক বিঔপনিবেশিক বয়ান হাজির করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বনজীবী ও বননির্ভর জনগণের চোখে ম্যানগ্রোভ বন দেখার তৎপরতা রাষ্ট্র এখনো শুরু করেনি। তাই দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলো ক্ষতবিক্ষত ও নিরন্তর নিখোঁজ হচ্ছে। একটা সময় ম্যানগ্রোভ বনকে ‘বাণিজ্যিক চিংড়িঘেরের’ জমি হিসেবে দেখা হয়েছে, সম্প্রতি হট্টগোল তোলা হচ্ছে ‘কার্বন শোষণাগার’ হিসেবে।
২০১৫ সালে ইউনেসকোর সাধারণ সম্মেলনে ২৬ জুলাইকে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। সুন্দরবনসহ দেশের ম্যানগ্রোভ বনের ‘লাশগুলো’কে নয়া উদারবাদী উন্নয়ন-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে হাজির করার পাশাপাশি লোকায়ত জ্ঞাননির্ভর সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা ও বন-দর্শনকে বিঔপনিবেশিক নীতি হিসেবে প্রস্তাব করছি চলতি আলাপে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ম্যানগ্রোভ
- বন রক্ষা