স্বাস্থ্যবিমা কেন এখন সময়ের দাবি?
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গড় আয়ু বেড়েছে, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে এবং চিকিৎসাসেবার পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এই ইতিবাচক অগ্রগতির আড়ালে একটি কঠিন বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—অসুস্থতা এখন শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিও। একটি দুর্ঘটনা, হৃদ্রোগ, ক্যানসার, কিডনি জটিলতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কোনো অসুস্থতা মুহূর্তেই একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়, জমি বিক্রি করতে হয়, ঋণ নিতে হয় কিংবা সন্তানের শিক্ষা পর্যন্ত ব্যাহত করতে হয়। ফলে আজ স্বাস্থ্যবিমা আর বিলাসিতা নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল অধিকাংশ দেশ বহু আগেই উপলব্ধি করেছে যে স্বাস্থ্যসেবাকে পুরোপুরি ব্যক্তির সামর্থ্যের ওপর ছেড়ে দিলে সমাজে বৈষম্য বাড়ে এবং অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তারা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যবিমা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কোথাও রাষ্ট্র পুরো ব্যয় বহন করে, কোথাও সরকার, নিয়োগকর্তা এবং নাগরিক যৌথভাবে ব্যয় ভাগ করে নেয়, আবার কোথাও সামাজিক স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয়ের ঝুঁকি সবার মধ্যে বণ্টন করা হয়। মূল দর্শন একটাই—কোনো মানুষ যেন শুধু চিকিৎসার খরচের কারণে দরিদ্র হয়ে না পড়ে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো মানুষকে নিজের পকেট থেকেই পরিশোধ করতে হয়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় Out-of-Pocket Expenditure। আন্তর্জাতিক গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, যেসব দেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের হার বেশি, সেসব দেশে চিকিৎসাজনিত দারিদ্র্যও বেশি। একজন মানুষ বহু বছর ধরে সঞ্চয় করেও একটি বড় অসুস্থতার পর অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে যেতে পারেন। এই বাস্তবতা শুধু দরিদ্র মানুষের নয়; নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যও সমানভাবে সত্য।
ধরা যাক, একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হঠাৎ স্ট্রোক করলেন বা কিডনি বিকল হয়ে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হলো। চিকিৎসা ব্যয় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের নিয়মিত আয় কমে যেতে পারে, অথচ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তখন চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে থাকা, যাতায়াত এবং কর্মঘণ্টা হারানোর সম্মিলিত প্রভাব পুরো পরিবারকে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। অর্থাৎ অসুস্থতার প্রভাব শুধু রোগীর শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো পরিবারের অর্থনীতিকে নাড়া দেয়।
স্বাস্থ্যবিমার মূল ধারণা অত্যন্ত সহজ। বহু মানুষ নিয়মিত ছোট একটি অর্থ একটি তহবিলে জমা দেন। সেই তহবিল থেকে যাঁদের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাঁদের ব্যয় বহন করা হয়। অর্থাৎ একজনের বড় ঝুঁকি অনেক মানুষের ছোট ছোট অবদানের মাধ্যমে ভাগাভাগি করা হয়। এটিই ঝুঁকি বণ্টনের (Risk Pooling) মৌলিক নীতি। এই ব্যবস্থার ফলে কোনো একটি পরিবারকে একসঙ্গে বিপুল চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ নিতে হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই Universal Health Coverage (UHC) বা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, মানুষ যেন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু সেই সেবা নিতে গিয়ে আর্থিক দুর্ভোগে না পড়ে। স্বাস্থ্যসেবা তখনই কার্যকর, যখন তা মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে এবং চিকিৎসা নিতে গিয়ে পরিবারকে সর্বস্বান্ত হতে না হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- স্বাস্থ্য বিমা