দুর্নীতি ও গণতন্ত্র: যে শহরে কেউ লাল বাতি মানে না...
ভাবুন, এমন একটি শহর যেখানে লাল বাতি জ্বললেও কেউ গাড়ি থামায় না। কবে থেকে এমনটা শুরু হয়েছে, কেউ আর মনে করতে পারে না। হয়তো একদিন একজন তাড়াহুড়া করে সিগন্যাল অমান্য করেছিলেন। তারপর আরেকজন। তারপর আরও অনেকে। ধীরে ধীরে সবাই ধরে নিল লাল বাতি মানা এই শহরের নিয়ম নয়। নতুন চালকেরা পুরোনোদের দেখে সেটাই শিখল। একসময় আইন বইয়ে যা লেখা আছে, আর রাস্তায় যা ঘটে—দুটো আলাদা জিনিস হয়ে গেল।
এবার ভাবুন, একদিন একজন চালক ঠিক করলেন তিনি লাল বাতি মেনেই দাঁড়াবেন। সবচেয়ে বিপদে পড়বেন কে? অদ্ভুত শোনালেও সত্যিটা হচ্ছে তিনিই। কারণ তিনি ভুল করছেন না। কিন্তু তাঁর পেছনের চালক ধরে নিয়েছেন সামনে কেউ থামবে না। সামনের চালকও ধরে নিয়েছেন পেছনের গাড়ি থামবে না। সমস্যাটা তাই শুধু নিয়ম ভাঙার নয়। সমস্যাটা হলো সবাই সবার সম্পর্কে একই প্রত্যাশা পোষণ করছে।
আমার কাছে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে অনেক সময় সেই শহরের মতো মনে হয়।
অলিখিত নিয়ম
আমাদের নিয়ম ভাঙা সাধারণত বড় কোনো দুর্নীতি দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় ছোট ছোট মানিয়ে নেওয়া দিয়ে। কেউ সিগন্যাল মানে না, তাই আমরাও থামি না। রাস্তায় ময়লা ফেলা নিষেধ—এটা আমরা জানি। তবু দেখি অন্য সবাই ফেলছে, আমরাও ফেলি। ফুটপাতে থুতু ফেলা অশোভন—এটাও জানি। কিন্তু যখন দেখি কেউ মানছে না, তখন নিজেরাও আর মানার প্রয়োজন বোধ করি না।
নিয়মগুলোকে আমরা অনেকটা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো দেখি। জানা ভালো, কিন্তু সব সময় মানতেই হবে এমন নয়। প্রতিটি শর্টকাট আলাদাভাবে দেখলে যুক্তিসংগত মনে হয়। কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে মিলেই এমন এক সমাজ তৈরি করে, যেখানে নিয়ম মেনে চলাটাই বোকামি বলে মনে হয়।
দুর্নীতি এই মানিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে পরিণত রূপ। এটি শুধু চুরি নয়। এটি এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে সবাই ধরে নেয় অন্যরাও একই কাজ করবে। তাই এর শিকড় শুধু সচিবালয়ে নয়, শুধু ব্যবসায় নয়, শুধু রাজনীতিতেও নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে, আমাদের পারস্পরিক প্রত্যাশায়।
আমরা সাধারণত দুর্নীতিকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। বলি, রাজনীতিবিদেরা লোভী। আমলারা অসৎ। ব্যবসায়ীরা মুনাফাখোর। নাগরিকেরা উদাসীন। কথাগুলোর মধ্যে সত্য আছে। কিন্তু এগুলো অভিনেতাদের বর্ণনা দেয়, নাটকের মঞ্চটিকে নয়।
আসলে একটি সমাজে দুই ধরনের নিয়ম থাকে। এক ধরনের নিয়ম লেখা থাকে আইনের বইয়ে। আরেক ধরনের নিয়ম লেখা থাকে মানুষের আচরণে। অনেক সময় দ্বিতীয় নিয়মটিই প্রথম নিয়মকে হারিয়ে দেয়। বাংলাদেশের সমস্যা শুধু এই নয় যে অনেকেই নিয়ম ভাঙে। আরও বড় সমস্যা হলো, আমরা ধরে নিই অন্যরাও নিয়ম মানবে না। আবার অন্যরাও ধরে নেয়, আমরাও নিয়ম মানব না। এই পারস্পরিক প্রত্যাশাই ধীরে ধীরে অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়।
মানুষ ধরে নেয় সরকারি টাকা কীভাবে খরচ হলো, তার হিসাব কেউ দেবে না। রাজনীতিবিদেরা ধরে নেন তাঁদের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আমলারা ধরে নেন নিয়মের চেয়ে বিবেচনার দাম বেশি। স্থানীয় দালালেরা ধরে নেন পৃষ্ঠপোষকতাই স্বাভাবিক। নাগরিকেরাও ধরে নেন প্রশ্ন করে বিশেষ লাভ নেই।
এভাবেই আমরা এমন এক স্থিতাবস্থায় পৌঁছে যাই, যা ভালো বলে টিকে থাকে না। টিকে থাকে কারণ বহুদিন ধরে সবাই এভাবেই চলতে শিখেছে। আজ আমরা এই পথে হাঁটছি শুধু এই পথটি ভালো বলে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে এই পথে হাঁটতে হাঁটতে সেটাই আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই এখন অন্য পথে হাঁটতে গেলেই অস্বস্তি হয়—নিজেরও, অন্যেরও।