আবুল কাসেম ফজলুল হক : চরিত্রবান বুদ্ধিজীবী
আমার জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি, প্রতি পাঁচ বছর পরপর কিছু কিছু মানুষ হঠাৎ বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মঞ্চে ‘বুদ্ধিজীবীর’ অভিনয় করতে আসেন। টিভির পর্দায় সারাক্ষণ তারা থাকেন। টিভির সামনে-পেছনে সবখানে তাদেরই কণ্ঠস্বর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
মাঝে মাঝে ভ্রম হয় টিভির এন্টেনার মাথায়ও হয়তো তারাই বসে থাকেন আর বলতে থাকেন, ‘তফাৎ যাও!’ রাষ্ট্রীয় আলোচনা-সভা-সেমিনার ও নৈশভোজের টেবিলগুলোয় তারা সাম্রাজ্য বিস্তার করে থাকেন। সব অনুষ্ঠানে তারা; প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতির পেছনে, ডানে, বামে সবখানে তারা। কখনো নত হয়ে থাকতে দেখি। কখনো হেলে-ঝুঁকে বা কদমবুসিরত অবস্থায় দেখি। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
এইসব মৌসুমি ‘বুদ্ধিজীবী’দের দেখে কয়েকটি প্রশ্ন বারবার আমার মাথার মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকত এবং এখনো মারে। প্রশ্নগুলো হচ্ছে, এই ভদ্রলোকদের বাড়ি কোথায়? ছাত্রজীবনে তিনি কোন দল করতেন? ওই জীবনে তিনি কী কী সব কাণ্ড ঘটিয়েছেন?
প্রত্যেককে আমার আহমদ ছফা কথিত একেকজন ‘আলি কেনান’ বলে মনে হয়। কারণ, এদের প্রত্যেকেরই উত্থানের একটা করে সার্বভৌম কাহিনি থাকে। পরিশেষে তৈরি হয় একটি করে পতনের কাহিনি। সে বড় রোমহর্ষক!
আবুল কাসেম ফজলুল হক ০৫ জুলাই ২০২৬ গত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তিনি যে এদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী ছিলেন এই কথাটা আমার না। এই বাক্য বুঝে না-বুঝে এদেশের সব মিডিয়া উৎপাদন করছে এবং শিক্ষিত মানুষদের মুখেও শুনতে পাচ্ছি। এই বাক্যটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উৎপাদিত হয়েছে। কথাটা তার মৃত্যুর পরে শোনা যাচ্ছে তা না। আমি অন্তত ত্রিশ বছর ধরে শুনছি এবং অবশ্যই আমিও মনে করি, আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী ছিলেন।
তাকে দেখে ও শুনে আমার মাথায় কখনো এই প্রশ্ন জাগেনি যে, তার বাড়ি রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির এলাকায় কি না। ছাত্রজীবনে তিনি কোন দল করতেন তাও আমার জানতে ইচ্ছে হয়নি। আর ওই ছাত্রজীবনে তিনি কী কী সব কাণ্ড করেছেন সে প্রশ্নও আমার মাথায় আসেনি।
তাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদের লোকদের পেছনে-সামনে-ডানে-বায়ে সরীসৃপ প্রাণীর মতো বুকে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য কথার তুবড়ি ফুটিয়ে ভাঁড়ামি করতে দেখিনি।
তাকে ত্রিশ বছর ধরে একইভাবে দেখেছি। দেখেছি তিনি ক্রমাগত বলে যাচ্ছেন, লিখে যাচ্ছেন তারও বেশি। তার ওইসব লেখার ও বলার কেন্দ্রে বরাবর ছিল মানুষ; সাধারণ মানুষ; বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ; বিপন্ন ও ক্ষমতাহীন মানুষ।
তাকে মাঝে মধ্যেই দেখেছি সেইসব ব্যানার ফেস্টুনের পেছনে, যার গায়ে লেখা থাকত রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে বিচারপ্রার্থী কোনো অসহায় পিতা-মাতা বা ভাইবোনের অসহায় আর্তি বা কোনো গোষ্ঠীর ন্যায্য দাবি-দাওয়ার কথা।
মাঝে মাঝেই তাকে নিয়ে ভাবিত হয়ে উঠেছি। ভেবেছি, লোকটা বোকা না কি? ‘এই সময়ে’ এইসব কাজে-কথায় থাকতে হয়! আবার এও সত্য যে, তাকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত হতে গিয়ে এমন শক্তিধর কোনো চরিত্র কখনো কল্পনা করতে পারিনি যিনি আবুল কাসেম ফজলুল হককে তার হক কথা ও কাজের জন্য চোখ রাঙানোর সাহস দেখাচ্ছেন।
সরকারে কোন দল আছে বা নেই সেই অনুযায়ী তার কথার পারদকে কখনো উঠানামা করতে দেখিনি। বলার সময় মুখভঙ্গিও পরিবর্তিত হতে দেখিনি। একই দরবেশী স্থিরতায় তিনি প্রয়োজনীয় ও উচিত কথাগুলো বলে গিয়েছেন; কাজগুলো করেছেন।
কখনো কখনো তাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সামনে কথা বলতে দেখেছি। ওইসব সময় তার নির্বিকার ভঙ্গি ও বাক্য প্রক্ষেপণ দেখে একই মঞ্চে উপবিষ্ট রাষ্ট্রের বড় বড় মানুষদের কখনো কখনো ম্লান মনে হয়েছে। শুধু বলার কথা বলি কেন, লেখার ভেতরেও ওইরকম একটা ঋষিজ নির্লিপ্ততা লক্ষ্য করা যায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মারা গেছেন
- স্মরণ
- আবুল কাসেম ফজলুল হক