আশুরার তাৎপর্য ও কারবালার মাহাত্ম্য
আরবিতে ‘আশারা’ মানে দশ, আর ‘আশুরা’ অর্থ দশম তারিখ। পরিভাষায় মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আশুরা ইসলামের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ দিবস। সৃষ্টির শুরু থেকে আশুরার দিনে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।
আল্লাহ–তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে নুহ (আ.)-এর প্লাবন সমাপ্ত হয়েছে এবং তাঁর নৌকা তুরস্কের ‘জুদি’ পর্বতে গিয়ে থেমেছে। এই দিন ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে ৪০ দিন পর নিরাপদে মুক্ত হন। এই দিন ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান। এই দিনে আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর পর রোগমুক্তি লাভ করেন। এই দিনেই সুলাইমান (আ.) তাঁর হারানো রাজত্ব ফিরে পান। এই দিনে ইয়াকুব (আ.) হারানো পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে ৪০ বছর পর ফিরে পান। এই দিনে ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন এবং এই দিনই তাঁকে দুনিয়া থেকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। আশুরার দিনে আরও বহু ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।
পূর্বে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। দ্বিতীয় হিজরিতে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা সুন্নত হয়ে যায়। তবে সুন্নত রোজার মধ্যে আশুরার রোজা সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ। (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, দারেমি ও মুসনাদে আহমাদ)
নবীজি (সা.) মদিনায় এসে দেখতে পান, ইহুদিরাও এদিন রোজা রাখে। এর কারণ জানতে পারলে বলা হয়—এদিনে মুসা (আ.) তাওরাত কিতাব লাভ করেন। এদিনেই তিনি বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার করে নীল নদ অতিক্রম করেন এবং ফেরাউনের সলিলসমাধি হয়; তাই তারা এদিন রোজা রাখে। নবী করিম (সা.) বললেন, ‘আমরা মুসার অধিক আপন। তোমরা ইহুদিদের ব্যতিক্রম করো; আশুরার এক দিন পূর্বে বা এক দিন পরেও রোজা রাখো।’ (মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম ও আবু দাউদ)
আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আমি আশাবাদী, তিনি পূর্বের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)
হজরত হাফসা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি আমল কখনো পরিত্যাগ করেননি—আশুরার রোজা, জিলহজ মাসের প্রথম দশকের রোজা, আইয়ামে বীজ (প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ)-এর রোজা এবং ফজরের ফরজের পূর্বে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ। প্রিয় নবীজি (সা.)-এর প্রিয় তিনটি আমল, যা তিনি কখনো পরিত্যাগ করেননি—তাহাজ্জুদ নামাজ, প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা এবং রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ। (জামিউস সগীর ও সহিহ বুখারি: ১৯৭৫)
৬১ হিজরি সনের মহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরার দিনে ইরাকের কুফা নগরীর কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে নবীদৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। তিনিসহ নবী বংশেরই ৭০ জন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শাহাদাতবরণ করেন। মানবতার ইতিহাসে এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা।
আরবি ‘কারব’ ও ‘বালা’ শব্দের সমন্বয়ে ‘কারবালা’—কারব মানে সংকট, বালা মানে মসিবত। তাই কারবালা সংকট ও মসিবতের দৃষ্টান্ত। কারবালার এই বিয়োগান্ত ঘটনা মহিমান্বিত মহররম মাসের ঐতিহাসিক আশুরার দিনে সংঘটিত হওয়ায় এতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পবিত্র আশুরা