পাকিস্তানের পারমাণবিক সুরক্ষা : একটি বিশ্লেষণ
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সর্বাধিক আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো-পাকিস্তান প্রদত্ত একটি সম্ভাব্য ‘পারমাণবিক আচ্ছাদনের’ (Nuclear Umbrella) আওতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। একাধিক বিশ্লেষক, কৌশলবিদ এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক অনেক ক্ষেত্রেই অতি মাত্রায় উৎসাহী হয়ে এবং আবেগপ্রবণতার বশবর্তী হয়ে মনে করছেন, ভারতের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক আধিপত্য, সীমান্তে অবিরাম হত্যা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং কৌশলগত বেষ্টনী নীতির মোকাবিলায় এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধ ও সামগ্রিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি আকর্ষণীয় বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, এর মাধ্যমে এমন একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে কোনো সামরিক আগ্রাসন পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে সক্রিয় করতে বাধ্য করবে। ফলে ভারতের সম্ভাব্য আগ্রাসনের রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য অনেক বেড়ে যাবে এবং নয়াদিল্লিও হয়তো আরও সংযত অবস্থান গ্রহণে বাধ্য হবে।
কিন্তু বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং সামরিক কৌশলের বিচারে এ ধারণাটি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। উপরন্তু এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে নতুন ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে। প্রথমত, পাকিস্তানের পারমাণবিক নীতির বাস্তবতার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্মই হয়েছে ভারতের সামরিক শক্তিকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে। ঐতিহাসিকভাবে তাদের পারমাণবিক নীতি পুরোপুরিভাবে ভারতকেন্দ্রিক; তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে নয়। অন্যদিকে, ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য Extended Nuclear Deterrence প্রদান করে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সামরিক জোট, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, অগ্রবর্তী মোতায়েনব্যবস্থা কিংবা আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক প্রতিরক্ষা নীতি নেই। ফলে বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের যে কোনো পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি বাস্তব অপারেশনাল সক্ষমতার চেয়ে প্রতীকী ঘোষণা হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দ্বিতীয়ত, ভৌগোলিক বাস্তবতা।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মাঝখানে বিস্তৃত ভারতীয় ভূখণ্ড ও আকাশসীমা অবস্থান করছে। ফলে যে কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশকে দ্রুত প্রচলিত সামরিক সহায়তা দেওয়া কার্যত অসম্ভব। কার্যকর পারমাণবিক প্রতিরোধ তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন নিরাপত্তা-দাতা রাষ্ট্রের হাতে সামরিক হস্তক্ষেপের বাস্তব সক্ষমতা এবং সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট কোনো সংঘাতে পাকিস্তান আদৌ ভারতের বিরুদ্ধে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে কি না-সেটিও অত্যন্ত অনিশ্চিত। বিশেষত, পাকিস্তান নিজেই সরাসরি আক্রমণের মুখে না পড়লে তা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ নিজেকে একটি শান্তিপ্রিয়, দায়িত্বশীল এবং অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর তাই পাকিস্তানের পারমাণবিক নিরাপত্তাবলয়ের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে যুক্ত হওয়ার ধারণা বাংলাদেশের এই ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পারমাণবিক কর্মসূচি