জনসমর্থনের পরও কেন বারবার সংস্কার আটকে যায়
বাংলাদেশে সংস্কার নিয়ে কথাবার্তা নতুন বিষয় নয়। ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, কর প্রশাসনকে আধুনিক করা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কিংবা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করার দাবি বহুদিনের।
অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সংস্থা—প্রায় সবাই এসব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে। তবু বাস্তবে দেখা যায়, সংস্কারের উদ্যোগ বারবার থেমে যায়, বিলম্বিত হয় অথবা মাঝপথে ভেস্তে যায়।
প্রশ্ন হলো, কেন? অনেকেই বাংলাদেশের সংস্কার-ব্যর্থতার ব্যাখ্যা খোঁজেন রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। অন্তর্বর্তী সরকার অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক অধ্যাদেশ জারি করে দেখিয়েছে যে ইচ্ছার অভাবই প্রধান সমস্যা নয়, সমস্যা আরও গভীরে।
ব্যাংক খাতের লুটপাট, এনবিআর পুনর্গঠনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়নের ব্যর্থতা এবং জুলাই সনদকে ঘিরে সংঘাত—এসব ঘটনা একটি অভিন্ন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। প্রথমে কিছু প্রতিষ্ঠান বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়। পরে সেই ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আর শেষ পর্যন্ত নানা রাজনৈতিক, আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই বৈধতা দেয়। ফলে সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা প্রায়ই সদিচ্ছার অভাব নয়; বরং ক্ষমতা, স্বার্থ এবং ধারণার সংঘাত।
যখন প্রতিষ্ঠান লুটপাটের যন্ত্রে পরিণত হয়
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। গত দেড় দশকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আনুগত্য পুরস্কৃত করার একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো সহজে ঋণ পেয়েছে, বারবার ঋণ পুনঃ তফসিল করেছে, অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধ না করেও পার পেয়েছে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
এখানে সমস্যাটি শুধু দুর্নীতি নয়। সমস্যাটি হলো, এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে লুটপাটই সবচেয়ে লাভজনক আচরণে পরিণত হয়েছিল। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার জন্য ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়া যেমন যুক্তিসংগত হয়ে ওঠে, তেমনি ব্যাংকারদের জন্যও রাজনৈতিক নির্দেশ মেনে চলা নিয়ম মেনে চলার চেয়ে নিরাপদ হয়ে পড়ে।
ফলে একটি শক্তিশালী সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে ওঠে, যার স্বার্থ বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। তখন সংস্কার আর নীতিগত প্রশ্ন থাকে না; তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রশ্ন। দুর্নীতি তখন আর ব্যতিক্রম থাকে না; সেটিই হয়ে ওঠে ব্যবস্থার স্বাভাবিক নিয়ম।
রাষ্ট্রের ভেতরের ভেটো শক্তি
এনবিআর সংস্কার ঘিরে সংঘাত এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। করনীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের কাজ আলাদা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করা বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক দেশের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে এমন সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে আসছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার যখন অবশেষে সেই উদ্যোগ নিল, তখন অনেকের ধারণা ছিল, এটি একটি প্রশাসনিক সংস্কারমাত্র। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ অন্য কথা বলল। সংস্কারের ঘোষণা আসার পরপরই এনবিআরের একটি অংশ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কর্মবিরতি, প্রতিবাদ এবং বন্দর কার্যক্রমে বিঘ্নের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে সরকারকে কার্যত পিছু হটতে হয়।
এ ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উন্মোচন করেছে। রাষ্ট্র নাগরিকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু নিজের ভেতরের সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনেক সময় দুর্বল।
সরকার আইন করতে পারে, অধ্যাদেশ জারি করতে পারে, কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী গড়ে উঠলে তাদের সম্মতি ছাড়া পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে যায়। এনবিআরের ঘটনাটি দেখিয়েছে যে সংস্কার শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক প্রশ্ন; আর সেই রাজনীতির কেন্দ্রে থাকে ক্ষমতার বণ্টন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ব্যাংক খাত
- রাজনৈতিক প্রভাব