পচা পাটের গন্ধ ও সোনালি আঁশের হারানো দিন
বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে পাটের সম্পর্ক শুধু অর্থনীতির নয়, সংস্কৃতি ও স্মৃতিরও। বর্ষার পানিতে ডুবিয়ে রাখা পাটের আঁটি, খালের ধারে পাট জাগ দেওয়া, আর দূর থেকে ভেসে আসা পচা পাটের তীব্র গন্ধ—একসময় এ ছিল বাংলার চিরচেনা দৃশ্য। সেই গন্ধ অনেকের কাছে বিরক্তিকর হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কৃষকের স্বপ্ন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ইতিহাস এবং একটি জাতির অর্থনৈতিক উত্থানের স্মৃতি। আজও অনেক প্রবীণ মানুষ সেই গন্ধের কথা মনে করতে পারেন, কিন্তু পাটের সেই সোনালি দিনের কথা মনে করলে তাঁদের কণ্ঠে মিশে যায় দীর্ঘশ্বাস। কারণ পাটের গন্ধ এখনো কোথাও কোথাও পাওয়া যায়, কিন্তু পাটের গৌরব যেন ধীরে ধীরে চুকে গেছে।
একসময় বাংলাদেশকে বলা হতো বিশ্বের প্রধান পাট উৎপাদনকারী দেশ। স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তী কয়েক দশক পর্যন্ত পাট ছিল দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। ষাট ও সত্তরের দশকে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সিংহভাগ আসত পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। সেই কারণেই পাটকে বলা হতো “সোনালি আঁশ”। কৃষকের ঘরে নগদ অর্থের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই ফসল। গ্রামীণ অর্থনীতি, নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য, এমনকি অসংখ্য শিল্পনগরীর বিকাশও পাটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু যে ফসল একসময় দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল, আজ তার অবস্থান অনেকটাই প্রান্তিক। কৃষকেরা ধান, ভুট্টা, সবজি কিংবা অন্যান্য লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বহু প্রতিষ্ঠান লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। কর্মহীন হয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—কীভাবে এমন একটি সম্ভাবনাময় শিল্প এই অবস্থায় এসে দাঁড়াল?
পাটশিল্পের এই অবক্ষয়ের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং আমাদের নিজস্ব নীতিগত সীমাবদ্ধতার দীর্ঘ ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে প্লাস্টিক ও সিনথেটিক তন্তুর ব্যাপক ব্যবহার বিশ্ববাজারে পাটের ঐতিহ্যগত অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। কম দাম, সহজ ব্যবহার এবং শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে প্লাস্টিক দ্রুত বাজার দখল করে নেয়। পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি তখনও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেমন গুরুত্ব পায়নি। ফলে প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে পাট তার স্বাভাবিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে না পারাও ছিল বড় একটি সমস্যা। বাংলাদেশের অধিকাংশ পাটকল দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থেকেছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। নতুন পণ্য উদ্ভাবন কিংবা গবেষণায় বিনিয়োগও ছিল সীমিত। যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পাটকে ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য তৈরির দিকে এগিয়ে গেছে, তখন আমরা মূলত বস্তা ও সুতার গণ্ডিতেই আবদ্ধ থেকেছি।
নীতিগত অসামঞ্জস্যও পাটশিল্পের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কৃষক অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পাননি, পাটকলগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে, বিপণন ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে অদক্ষতা ও অনিয়ম। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতিও শিল্পটির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে কৃষক, শ্রমিক ও উদ্যোক্তা—কেউই এই খাতের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী আস্থা ধরে রাখতে পারেননি।
অন্যদিকে প্রকৃতির পরিবর্তনও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নদী-খাল ভরাট, জলপ্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনেক এলাকায় পাট জাগ দেওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ আর আগের মতো নেই। উন্নত রেটিং প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত। এর ফলে পাটের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সোনালি আঁশ পাট
- বৈদেশিক মুদ্রা