সংকটে যাদুকাটা নদী : এখনই ব্যবস্থা নিন

যুগান্তর ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০২৬, ১১:৪৩

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক যাদুকাটা নদী আজ গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। যে নদী এক সময় স্বচ্ছ নীলাভ পানি, পাহাড়ঘেরা অপরূপ দৃশ্য, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং অপার পর্যটন সম্ভাবনার জন্য পরিচিত ছিল, আজ সেই নদী অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের নির্মম আগ্রাসনে বিপর্যস্ত। উন্নয়নের নামে, আর্থিক লাভের আশায় এবং একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সীমাহীন লোভের কারণে নদীটির প্রাকৃতিক অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।


ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যাদুকাটা নদী প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। ৩২ থেকে ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ আন্তঃসীমান্ত নদী বহু বছর ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসাবে কাজ করে এসেছে। পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা, নৌপরিবহণ এবং খনিজসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে নদীটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কিন্তু গত কয়েক বছরে এ নদীকে কেন্দ্র করে যে বাণিজ্যিক লুটপাট শুরু হয়েছে, তা এর অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বালু ও পাথর উত্তোলনের নামে চলছে এক নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ। ড্রেজার মেশিন, বোমা মেশিন এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নদীর বুক চিরে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তলদেশের ভারসাম্য এবং প্রাকৃতিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের ফলে তীব্র নদীভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ নদীভাঙনের কারণে বহু গ্রাম বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। লাউড়েরগড়, শিমুলবাগান, ঘাগটিয়া, সাহিদাবাদ, মানিগাঁও, কুনাটছড়াসহ অসংখ্য গ্রামের মানুষ আজ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কৃষিজমি নদীতে বিলীন হচ্ছে, বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ছে।


যাদুকাটা নদীর পরিবেশ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যের তোয়াক্কা না করেই যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে নদীর গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও নদী অতিরিক্ত গভীর হয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার তলদেশ ভেঙে গিয়ে প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে নদীর দুই তীরে চাপ বাড়ছে এবং নদীভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। বালু ও পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল বিলীন হচ্ছে এবং পুরো বাস্তুতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।


পরিবেশবিদদের মতে, নদীর স্বাভাবিক তলদেশ ও পানিপ্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। নদীর জল ধারণক্ষমতা কমে যাবে, বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চল এক বৃহত্তর পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা আরও উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেছে। গত আড়াই দশকে যাদুকাটা নদীসংলগ্ন অঞ্চলে ভূমি ব্যবহারের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ২০০০ সালের দিকে যেখানে বসতবাড়ি ও অবকাঠামোগত ব্যবহারের পরিমাণ ছিল মাত্র ২.৮ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ শতাংশে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তার এবং অনিয়ন্ত্রিত মানবিক হস্তক্ষেপের কারণে বনভূমি ও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।


যাদুকাটা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটনশিল্পও আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। শিমুলবাগান, বারেক টিলা, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা এবং স্বচ্ছ নীলাভ পানির সৌন্দর্য একসময় পর্যটকদের কাছে ছিল এক অপূর্ব আকর্ষণ। কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীভাঙন ও পরিবেশ দূষণের কারণে সেই সৌন্দর্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা, নৌযান চালক, স্থানীয় দোকানদার এবং পর্যটক গাইডদের আয়ও কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ, পরিবেশ ধ্বংসের প্রভাব সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও পড়ছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও