তোফায়েল ভাইকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

বিডি নিউজ ২৪ সালেহ উদ্দিন আহমদ প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২৬, ১২:১৭

তোফায়েল আহমেদ, আমাদের তোফায়েল ভাই চলে গেলেন। যারা তাকে শুধু হাল-আমলের চশমা দিয়ে চেনেন, তার সম্বন্ধে তারা খুবই কম জানেন। যারা তাকে ১৯৬৯ সালের আন্দোলন থেকে চেনেন, তারা তাকে জানেন একজন সংগ্রামী সংগঠক ও স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বিশাল কর্মপুরুষ হিসেবে।


চেষ্টা হয়েছিল একাত্তরকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ গড়তে। সেটা সফল হলে তোফায়েল আহমেদকে স্মরণ করা কিংবা তাকে নিয়ে আজকের এই লেখা হয়তো সম্ভব হতো না। যেহেতু সেই উদ্যোগ সফল হয়নি, তাই আমরা তোফায়েল আহমেদকে সম্মান জানাতে পারছি। আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামে তার অবদানকে এই জাতি কীভাবে ভুলবে?


১৯৬৮-১৯৬৯ বছরগুলো বাংলার ইতিহাসে অন্য বছরগুলোর মতো ছিল না। ঘটা করে তখন পালিত হচ্ছিল আইয়ুব খানের বাংলাকে শোষণের আরও এক দশক, সরকারি নাম ‘ডিকেড অফ রিফর্মস’।


১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার একটা প্রেস নোট জারি করে। সেখানে বলা হয়, পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার একটা নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে আগরতলায়। ১৮ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয়, এ ষড়যন্ত্রের প্রধান আসামি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯ মে আরও কয়েকজনসহ শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে জেলখানায় নেওয়া হয়। শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি করে বিচার শুরু হয় বিশেষ সামরিক আদালতে। চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ এবং এক ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা। রাজনৈতিক নেতাদের প্রায় সবাই কারারুদ্ধ, যারা বাইরে ছিলেন, তারা আবার পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।


১৯৬৯ সালে তোফায়েল আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ছিলেন। তার নেতৃত্বেই ধীরে ধীর প্রতিবাদ দানা বাঁধতে শুরু করে। তোফায়েল ভাই ডাকসুর নেতৃত্বে গড়ে তুললেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। মূল লক্ষ্য, সব রাজবন্দিদের কারাগার থেকে বের করে আনা। আগরতলা ষড়যন্ত্রের উদ্যত ছোবল থেকে বাঁচাতে হবে বাংলার সেই সাহসী মানুষগুলোকে, নতুবা এদের সবার ফাঁসি হয়ে যাবে সামরিক আদালতে। এগারো দফার ভিত্তিতে তাই আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হয়। শেখ মুজিবের দেওয়া ছয় দফা দাবিও এগারো দফার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


আমি ছিলাম এই আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। খুব কাছ থেকে দেখেছি তোফায়েল ভাইকে। যখনই প্রয়োজন হয়েছে কাছে ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন।


খালেদ মোহাম্মদ আলী তখন ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৯-এর আন্দোলনের একদিন তার চোখে সরাসরি টিয়ার গ্যাসের শেল এসে আঘাত হানে। তোফায়েল ভাই এগিয়ে এলেন, মহসিন হলে নিয়ে খালেদ ভাইকে পরিচর্যা করতে বললেন।


আন্দোলনের প্রথম দিকে আমরা সারাদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে পিকেটিং করতাম, তারপর আন্দোলন শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত। বিকেলে আমরা তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ফিরে আসতাম। সর্বদলীয় পরিষদের নেতারা বসতেন পরবর্তী দিনের কর্মসূচি ঠিক করতে। তখন বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ নিজেদের সমস্যা নিয়েও তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তোফায়েল ভাই সবার কথা শুনতেন।


সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো কোনোদিন ভুলবার নয়। এগারো দফা আন্দোলন তোফায়েল আহমেদের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে থাকবে। তার ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যদের সঙ্গে দরকষাকষি করার ক্ষমতা। তিনি যে এতগুলো ছাত্র সংগঠনকে কীভাবে একত্র করে এগারো দফার পক্ষে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তা কাছ থেকে না দেখলে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অনেক কিছুই আমি বুঝতাম না। এই আন্দোলনে আইয়ুবপন্থী এনএসএফও যোগ দিয়েছিল মাহবুবুল হক দোলন ও নাজিম কামরান চৌধুরীর নেতৃত্বে। তাদেরকে বলা হয়েছিল, পরিষদ বিরোধিতা শুধু গভর্নর মোনেম খানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে। অথচ এই আন্দোলনই আইয়ুব খানের গদি তছনছ করে তাকে গদিছাড়া করল। পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলো এবং শেখ মুজিবসহ অন্য সব আসামিকে মুক্ত করে দিল।


১৯৬৯ সালে হঠাৎ যেন তোফায়েল আহমেদ নামটা উল্কার মতো আমাদের রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিল। এটা অনিবার্য সত্য যে, ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী ছাত্র-আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা। এই পর্ব থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে তোফায়েল ভাই রেখেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর।


আরেকটা স্মৃতি—১৯৭২ সালের কোনো এক সময়। তখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বাসায় প্রায়ই যেতাম। জয়নুল ভাই বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পসামগ্রী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যেতেন। মসলিন, জামদানি, কাঁথা, চাদর, নাও-সাম্পান, হুঁকো, বাঁশি, পালকি, ঢেঁকি, পিঠা, কলসি, খড়ম—কিছুই বাদ যেত না।


একদিন শিল্পাচার্য বললেন, “আমি একটা লোকশিল্প জাদুঘর গড়তে চাই, যেখানে হরেক রকম গ্রামীণ শিল্পকর্ম সংরক্ষিত হবে।” তিনি আরও বললেন, সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এই প্রকল্প সম্ভব নয়। আমি জয়নুল ভাইকে হঠাৎ প্রস্তাব করলাম আমার সঙ্গে গণভবনে যেতে। আমি জানতাম গণভবনে তোফায়েল ভাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব। শিল্পাচার্য গণভবনে গেলে তোফায়েল ভাই নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করাবার আয়োজন করবেন, এই বিশ্বাস আমার ছিল। জয়নুল ভাইকে খুব উৎসাহিত মনে হলো না। তিনি বললেন, “যা শুনেছি তার ধারেকাছে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি দেশের কত জরুরি কাজে ব্যস্ত। এসব শোনার তার সময় কোথায়?”


একসময় শিল্পাচার্যকে রাজি করালাম। আমরা রিকশা করে গণভবনে গেলাম। তোফায়েল ভাইকে খুঁজে বের করলাম, তাকে বললাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এসেছেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটু দেখা করতে। তোফায়েল ভাই শিল্পাচার্যকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করালেন। বাংলার দুই সূর্যসন্তান একান্তে আলোচনা করলেন। সেই সাক্ষাতের সূত্র ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজকের সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প জাদুঘর।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও