রামিসা হত্যা: একটি অসুস্থ সমাজের বিবেকহীন আয়না
আট বছর বয়সী কন্যাশিশু রামিসার ক্ষতবিক্ষত, খণ্ডিত মরদেহ যখন প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নর্দমায় ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন আসলে কার মৃত্যু ঘটছিল? রামিসার? নাকি আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের অবশিষ্ট মনুষ্যত্বের?
শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের মুখে এক মাসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক এই তৎপরতা সান্ত্বনাকাতর শোনালেও, তা আসলে আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতাকে ঢাকতে পারে না। আট বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা, এবং তারপর নির্মমভাবে তার মরদেহ টুকরো টুকরো করে গুম করার চেষ্টা—এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা নয়; এটি একটি পচনশীল সমাজের গভীরতম নৈতিক অন্ধকূপের জবানবন্দি। রামিসা একা মারা যায়নি—তার সঙ্গে অপমৃত্যু ঘটেছে কোটি অভিভাবকের নিরাপত্তাবোধের, মরেছে শিশুদের নির্মল হাসির ওপর আমাদের সামষ্টিক বিশ্বাসের। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আত্মহননের জন্য দায়ী আমরা সবাই। আমরা যারা নীরব, যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে নীরবে মেনে নিই, যারা দলীয় ও গোষ্ঠীগত পরিচয়ের আড়ালে অপরাধীকে আড়াল করতে ব্যস্ত থাকি, তারা প্রত্যেকেই এই রক্তের ভাগীদার।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত করে দেয়। তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে দেশে ১১৮টি কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬টি শিশু। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে ধর্ষণের পর ১৪টি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, আর ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে খুন করা হয়েছে আরও ৩টি শিশুকে। লোকলজ্জা আর মানসিক ট্রমা সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ২ জন অবোধ শিশু।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ২৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর গাণিতিক অর্থ দাঁড়ায়—প্রতিদিন অন্তত একটি শিশু ধর্ষিত হচ্ছে এবং প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি শিশু ধর্ষণের পর লাশ হয়ে ফিরছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক নিস্তব্ধতার এক একটি কালজয়ী ইশতেহার। আমরা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লাইক দিই, মোমবাতি জ্বালাই, রাজপথে র্যালি করি, আর তারপর অবধারিতভাবে পরবর্তী আরেকটি নির্মমতার জন্য অপেক্ষা করি। রামিসার ঘটনা কোনো ভিন্ন আয়োজন নয়, এটি আমাদের সামাজিক অক্ষমতা ও অভ্যস্ততার এক চক্রাকার পুনরাবৃত্তি মাত্র।
মনস্তাত্ত্বিক ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো—অপরাধীরা ভুক্তভোগী শিশুদের অতি পরিচিত, প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয়। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় লিপ্ত ছিল তার আপন আত্মীয়। আর রামিসাকে পাশবিকভাবে হত্যা করেছে তাদের ঘরের পাশের প্রতিবেশী সোহেল রানা।
যাকে বিশ্বাস করতে শেখানো হয়, যার কাছে সন্তানকে নিরাপদ রাখার নিশ্চিন্ত আশ্বাস খোঁজে মা-বাবা, সেই ঘনিষ্ঠ মানুষটিই যখন রাতের অন্ধকারে আদিম দানব হয়ে ওঠে, তখন সামাজিক সম্পর্কের বুনন বা ‘সোশ্যাল ফেব্রিক’ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। আমরা আজ এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না; বরং একে অপরের সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, অপরাধীরা মনে করে ভুক্তভোগীকে জীবিত রাখলে প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ঝুঁকি থাকে, তাই তারা অবলীলায় হত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু রামিসার ক্ষেত্রে এই তত্ত্বও যথেষ্ট নয়। খুনি সোহেল রানা শুধু প্রমাণ লোপাট করতে দেহ টুকরো করেনি, সে তার নিজের স্ত্রীকে পর্যন্ত এই নারকীয় অপরাধের সহযোগী বানিয়েছে এবং ঘটনা গোপন রাখতে বাধ্য বা রাজি করিয়েছে। এখানে প্রশ্ন জাগে—সেই স্ত্রীর মনস্তত্ত্বে কী চলছিল? কেন সে একজন ধর্ষক ও খুনিকে ‘স্বামী’ পরিচয়ের দোহাই দিয়ে বাঁচাতে চাইল? আমাদের সমাজব্যবস্থা কি তবে এমন এক বিকৃতির স্তরে পৌঁছে গেছে যেখানে অপরাধী স্বামীকে রক্ষা করা স্ত্রীর অবশ্য পালনীয় ‘পুণ্যের কাজ’ বলে গণ্য হয়? যদি সামাজিকভাবে অপরাধীকে বাঁচানোর এই পারিবারিক ও এলাকাভিত্তিক ষড়যন্ত্র চলতে থাকে, তবে কাগজে-কলমে মৃত্যুদণ্ডের শত আইন পাস করেও কোনো সুফল মিলবে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ধর্ষণ ও হত্যা