বাড়ি ফেরার গল্প

দেশ রূপান্তর ড. মাহবুব হাসান প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২৬, ১১:৪৭

এত মানুষ ঢাকা শহরে যে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ভাবি, কেন মানুষ তার গ্রাম ফেলে নগরে আসে? কেন সে শেকড় ছিঁড়ে কংক্রিটে মোড়া নগর-মহানগরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে বাঁচার জন্য আসে? সে কি কেবলই আয়ের জন্য। আয় মানে ক্ষুধা, রূপকার্থে। রোজগার করতে পারলেই তো আয় হবে। আর আয় মানে টাকা>টাকা মানে>খাদ্য কেনার শক্তি>শক্তি মানে বাঁচা। আর কে না চায় বাঁচতে? ঢাকা মহানরে অগণন মানুষের চাপে আমরা হাঁসফাঁস করছি। বাসে ওঠা যায় না ভিড়ের কারণে। রিকশায় যাওয়ার চিন্তা করলে, অন্তর কেঁপে ওঠে দুই কারণে। কখন না আবার অ্যাক্সিডেন্ট করে। দ্বিতীয়ত ভাড়া দ্বিগুণ, তিনগুণ। কিংবা রিকশাওয়ালা এমনভাবে একশ টাকার ভাড়া দুইশ টাকা দাবি করেন, শুনেই পিলে চমকায়। কখনো কখনো এমন রাগ ওঠে যে, কোনো কথা মুখে আসে না। তখন নিজেকে দুর্ভাগ্যের একজন ভাবি। পরিবেশ দূষণের কথা নাই বা তুললাম। সুন্দর আর প্রকৃত সুন্দরের মধ্যে পার্থক্য কী, তা ভুলিয়ে দিয়েছে ঢাকা মহানগর। মানুষের বাঁচার উপাদান কেবল দালানকোঠা না, তার চিন্তাকে ধারণ করতে পারবে এমন সামাজিক পরিবেশ। মানুষের নীতিহীনতা এতটাই গর্হিত হয়ে উঠেছে যে, তা ‘কহতব্য’ নয়। ঢাকায় শ্বাস নেওয়ার জন্য যে পরিমাণ স্পেস থাকা দরকার খোলা মাঠ আর গাছপালাময় প্রকৃতি, তার কিছু নেই। এই ছোট আকারের মহানগরে যদি দুই বা আড়াই কোটি মানুষের বসতি হয়ে থাকে, তাহলে এতেই বুঝি আমরা মূলত মানুষের জঙ্গলে বাস করছি। আমরা এই মহানগরকে ‘কসমোপলিটান বিল্ডিংয়ের জঙ্গলে’ পরিণত করে ফেলেছি।


গরিব মানুষের আবাসন দেখলে আপনারা আঁতকে উঠবেন। বস্তি আর বস্তিসদৃশ আবাসনকে আবাসন বলা যায় না। মাথাগোঁজার ঠাঁই সেগুলো। কোনো মতে বেঁচে থাকা আর কি। আর বস্তির কথাই বা কী বলব? এই মহানগর মূলত বস্তির জন্য বিখ্যাত। সাঁইত্রিশ শ নাকি সাঁইত্রিশ হাজার বস্তি নিয়ে এই সুরম্য ঢাকা জনজঙ্গলে পরিপূর্ণ। গৃহকর্মী আর গার্মেন্ট কর্মীর মধ্যে পার্থক্য কেবল রোজগারের টাকায় প্রমাণ করা যায়। কিন্তু আবাসনের ক্ষেত্রে গার্মেন্ট কর্মী আর গৃহকর্মীর আবাসন একই জায়গায়। এরা প্রায় উদ্বাস্তু পর্যায়ের মানুষ। এদের ভাসমান বলতে পারি আমরা। ধরুন, কোনো গার্মেন্টকর্মীর চাকরি চলে গেলে সে অকুল পাথারে পড়ে যায়। কেননা, মাস যাবে কেমন করে? এটা গৃহকর্মীর জন্যও বলা যেতে পারে। তবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি মূলত কর্মবীর এবং অলসও কিছুটা। ফলে গৃহকর্মী ছাড়া তাদের সংসার চলে না। আয়- রোজগারে টান পড়ে, তারপরও তারা গৃহকর্মী রাখেন। একটা সময় হুড়মুড় করে গৃহকর্মীরা গার্মেন্ট কর্মীতে রূপান্তরিত হয়ে গেলে হাহাকার ওঠে মধ্যবিত্ত পরিবারে। তারা কোথায় পাবেন কাজের বুয়া? এই আক্ষেপের মধ্যে বছর কেটে যায়। শূন্যস্থান পূরণ করে গ্রাম থেকে আসা নতুন মেয়ে/মহিলারা। মহানগরে এভাবেই জনসংখ্যা বাড়ে। একজন গৃহকর্মীর সঙ্গে আসে বাচ্চা/কাচ্চারা। আসে তাদের ঘনিষ্ঠ স্বজন। তারাও আবার গৃহকর্মীতে পরিণত হয়। গ্রাম হারায় তাদের ফসল কাটার শ্রমজীবী মানুষ। এবার যখন পাহাড়ি ঢলে সিলেটের হাওরগুলোর ধান ডুবে যায়, সেগুলো কেটে আনার কামলা পায়নি কৃষক। ফলে অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে। সেই দৃশ্য আমরা দেখেছি টিভিতে, নিউজে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি কার্যকর পন্থা নিয়েছেন, কৃষককার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে। সরকার দিচ্ছেন সেই কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা-প্রণোদনার অর্থ। এতে আমার ধারণা, কিছু বস্তিবাসী ফিরে গেছেন বাড়িতে। আবার তারা কৃষিতে নিযুক্ত হবেন, সংসার গুছিয়ে নেবেন। এর মানে হচ্ছে, সরকারপ্রধান গ্রাম ও গ্রামের মানুষকে উন্নয়নের কেন্দ্র নিয়ে এসেছেন। আসলে গ্রামকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গ্রহণ করার চেতনাগত যে উন্নয়ন ধারণা ছিল, তা বদ্ধমূল হয়েছে। সেই নগরকেন্দ্রিকতা, তা পরিবর্তিত হয়ে গ্রামকেন্দ্রিকতায় রূপান্তরিত হবে।


সরকার যদি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইন গড়ে দিতে পারে, তাহলে কৃষক তার স্বস্থানে থেকে লাভবান হবে। মধ্যস্বত্বভোগী ফরিয়াদের খপ্পরে পড়ে থাকবে না তারা। আড়তদার ও পাইকার-মহাজনদের একাধিপত্য থাকবে না। কাঁচাবাজারের সঙ্গে পাইকারি বাজারের মধ্যে পণ্যমূল্যের ব্যবধান বেশি হবে না। সেই সঙ্গে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা এবং সচেতন নাগরিকরা যদি সজাগ থাাকেন, তাহলে এই কৃষি উৎপাদন চেইন ভবিষ্যতে আমাদের কৃষি সেক্টরের প্রাধান্য অর্জিত হবে। তবে, এই কাজগুলো তো সরকার একা করতে পারবে না। সরকারের এই নীতি-আদর্শ আর ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা দিতে হবে এই সেক্টরের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষকে। সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে পারলে, গ্রামকে নগর না বানিয়ে কেবল সুযোগকে সহজলভ্য করলেই নগর ও গ্রামের মধ্যকার সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যবধান উনিশ-বিশে চলে আসবে। গ্রামের সার্বিক উন্নয়নচিত্র হবে দুগ্ধ খামার, গরুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার, ছাগল- ভেড়ার খামার এবং পশুখাদ্যের উৎপাদনের টোটালিটি দিয়ে। একটি গ্রামকে মডেল হিসেবে গড়ে তুলে দেখতে হবে। উৎপাদিত পণ্য, শস্য কিংবা দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করতে হবে প্রতিটি জেলায়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে মৎস্য খামার। কৃষি জমিগুলোকে পরিকল্পিত চাষের আওতায় আনতে হবে। কোনো খালি জায়গা রাখা যাবে না। মানুষের বসবাসের উপযোগী গ্রাম ডিজাইন করতে হবে। গ্রামের আকার ও জনসংখ্যা অনুযায়ী পরিকল্পিত ডিজাইন করতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে সমন্বিত করেই তা করতে হবে। খেলার মাঠ ও স্কুল ইত্যাদি গড়ে নিতে হবে। শিক্ষকও নিতে হবে গ্রামের মানুষের শিক্ষিত ও উপযুক্তদের মধ্যে থেকে।


মোট কথা, উন্নয়ন মডেলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টি প্রাধান্যের তালিকায় থাকবে। এটা কোনো কাগুজে ডিজাইন নয়, গ্রামীণ মানুষের সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভেতরে থাকা চিন্তাকে কাজে লাগাতে হবে। এমন ডিজাইন ইউনিয়ন-কেন্দ্রিকও হতে পারে। আবার তার পরিধি বাড়িয়ে উপজেলাকেন্দ্রিক করা যায়। একটি জেলাকে মডেল করেও এই প্রকল্প প্রণীত হতে পারে, তা দেখবার আয়োজন করলে ভালো ফলের আশা আছে। তৃণমূল থেকে জেলা পর্যায়ের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আজ যারা মহানগরে রিকশা টানছে, আজ যারা মোটর লাগানো রিকশা চালাচ্ছে, তারা গ্রামে ফিরে যাবে। মূল লক্ষ্য গ্রামে ফিরে যাওয়ার মধ্যে কর্মসংস্থান জড়িত। নিজের বাড়িতে বা পাশর্^বর্তী গ্রামে বা ইউনিয়নে যদি কোনো রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, মুটে কাজ পায় তাহলে তারা ঘিঞ্জি বস্তিতে থাকবে না। সেগুলো কেবল অস্বাস্থ্যকরই নয়, নানা অপরাধেরও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বস্তিগুলোতে জরিপ চালালেই বেরিয়ে আসবে সেখানকার পরিবেশ ও পরিণতির সব দৃশ্যাবলি। মাদকের হিংস্র থাবাগুলো বস্তিকেন্দ্রিক। বস্তি উঠিয়ে দিলেই যে তা ভেঙে যাবে এমন নয়। মাদকের সরবরাহ চেইন বন্ধ করা গেলেই কেবল বস্তিগুলোতে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে। তবে আমরা চাই, বস্তিগুলো ছেড়ে যেন সেখানকার বাসিন্দারা নিজের বাড়িতে, নিজের গ্রামে ফিরে যায়। গ্রাম-কেন্দ্রিক উন্নয়ন চিন্তা ও বাস্তবায়নের মৌলিকতা একটি মেগা প্রকল্প। এর প্যাটার্ন পাল্টে দিতে হবে। পদ্মা ব্যারাজ, তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ কেবল কৃষির উপকারে আসবে না প্রভাব পড়বে সার্বিক অর্থনীতিতেও। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিভিত্তিক, সেটা মনে রেখে বহুমাত্রিক উন্নয়ন ধারার পরিকল্পনা নেওয়াই সব চেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সব পরিকল্পনা এঁটেছেন, তা দেখেই বোঝা যায় তিনি গ্রামকে কেন্দ্রের তালিকায় রেখেছেন। এই কাজটির সূচনা করেছিলেন শহীদ জিয়া। আর বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র আর নারীর ক্ষমতায়নের বন্ধ দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আমরা সেই গণতান্ত্রিক পথের যাত্রী, যারা সব সময়ই নীতি আর আদর্শের অন্তরে বাস করে। মানুষের সেই অজানা-অচেনা অন্তরের খোঁজ রাখতে হবে।


মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনার পরশ নিতে হবে, তাহলেই তারা সরকারকে বুঝতে পারবে। সরকারও বুঝবে কী করতে হবে। এটা বোঝার জন্য সরকারের গবেষকরা বিশেষ দৃষ্টি অর্জন করতে পারেন। কৃষিতে যেমন বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করে চলেছেন একটির পর একটি ধানের নতুন জাত, সেই ধারা সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যেও চারিয়ে দিতে হবে, যাতে আমাদের সীমার মধ্যে অসীমের উপকার আমরা পাই। চিন্তা রাজ্যে দেশ ও দেশের আপামর জনগণের প্রতি সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশও একই সঙ্গে সৃজন করতে হবে। কারণ আমাদের শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সাংস্কৃতিক বিভাজন রয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ধর্মগত পার্থক্য রয়েছে। এই সব ধর্মানুভূতিকে ধারণ করবার মতো মনন ও মানসিক শক্তি আসে সাংস্কৃতিক চেতনার বহুমাত্রিক চেতনা ধারণের মাধ্যমে। ধর্মচর্চার মাধ্যমে  সম্প্রীতির বন্ধনকে অটুট করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে লৌকিক জীবনের মধ্যে, যেখানে গ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল, সহাবস্থানের সৌন্দর্য নিয়ে। আমরা সেই পরিণত সুগন্ধ চাই গ্রামের উন্নয়নের ভেতর।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও