শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা: ভবিষ্যতের ভিত কি ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে?
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি নামেনি। গ্রামের এক কাঁচা রাস্তা দিয়ে একটি ছোট ছেলে স্কুলের দিকে হাঁটছে। কাঁধে তার ভারী স্কুলব্যাগ, হাতে একটা ছেঁড়া খাতা। খাতার পাতায় গতকালের গণিতের অঙ্কগুলো অর্ধেক কাটা, অর্ধেক মুছে গেছে। পাশের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ তাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—“এই ছেলেটা কি সত্যিই কিছু শিখবে?” এই দৃশ্য শুধু একটি গ্রামের নয়। শহর থেকে গ্রাম, সরকারি স্কুল থেকে বেসরকারি কোচিং সেন্টার—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে এ ধরনের দৃশ্য প্রতিদিনই ঘটছে। প্রশ্নটা তাই আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়: আমরা কি সত্যিই একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি কেবল সার্টিফিকেট উৎপাদনের একটি কাঠামো দাঁড় করিয়েছি?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, সাক্ষরতার হারও উন্নতি করেছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সংখ্যার এই অগ্রগতির আড়ালে গুণগত মানের একটি গভীর সংকট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আজ অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করছে, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে তারা দুর্বল। পাঠ্যবই মুখস্থ করা হচ্ছে, কিন্তু বোঝার ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি থাকলেও মনোযোগ অনুপস্থিত। শিক্ষক আছেন, কিন্তু শিক্ষণ পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে পুরনো ধাঁচের। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এই সমস্যা আরও প্রকট। শহরের শিক্ষার্থীরা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে, আর গ্রামের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় মৌলিক শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
এই দুর্বলতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা। পুরো সিস্টেমটি ঘুরছে নম্বর ও GPA-এর চারপাশে। ফলে শিক্ষার লক্ষ্য জ্ঞান অর্জন না হয়ে পরীক্ষায় ভালো করা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন শিক্ষার্থী একটি কবিতা মুখস্থ বলতে পারছে, কিন্তু সেই কবিতার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারছে না। গণিতের সূত্র মুখস্থ করছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে না। এই মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতাকে সংকুচিত করছে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। এখনও দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে পরিচিত নন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, অংশগ্রহণমূলক ক্লাস বা সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষাদান—এসব ধারণা এখনও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। আবার অনেক শিক্ষক আর্থিক ও সামাজিকভাবে যথেষ্ট মূল্যায়ন পান না। ফলে পেশাটির প্রতি আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
পাঠ্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন আছে। শিক্ষার্থীদের এমন অনেক বিষয় পড়ানো হয়, যার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ কম। অথচ জীবন দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি জ্ঞান, পরিবেশ সচেতনতা বা আর্থিক শিক্ষার মতো বিষয় এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করেও বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হোঁচট খায়।
অবকাঠামোগত বৈষম্যও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলে যেখানে স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল বোর্ড ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি রয়েছে, সেখানে দেশের অনেক গ্রামীণ স্কুলে এখনও পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই, বিজ্ঞান ল্যাব নেই, এমনকি অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত শিক্ষকও নেই। করোনাকালে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। শহরের অনেক শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস করেছে, কিন্তু গ্রামের অসংখ্য শিক্ষার্থী ইন্টারনেট বা ডিভাইসের অভাবে শিক্ষার বাইরে থেকে গেছে।
শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, সামাজিক মানসিকতাও এই সংকটের জন্য দায়ী। বর্তমানে শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সামাজিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিভাবকদের বড় একটি অংশ সন্তানের সৃজনশীলতা বা মানসিক বিকাশের চেয়ে GPA ও মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপে বড় হচ্ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা