প্রতিবাদের নতুন ধারা : যুক্তি কম, আবেগ বেশি
বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত আন্দোলন, প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের ইতিহাস। এই ভূখণ্ডের মানুষ বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
কখনো ভাষার অধিকারের জন্য, কখনো গণতন্ত্রের জন্য, কখনো সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন শিক্ষার্থী আন্দোলন—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল প্রতিবাদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিবাদের ভাষা বদলেছে। বদলেছে তার মাধ্যম, রূপ, শব্দ, এমনকি মানসিকতাও।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতিবাদের ভাষা কেন বদলে যাচ্ছে? আগে সেই ভাষা কেমন ছিল, আর এখন কেমন হওয়া উচিত?
একসময় প্রতিবাদের ভাষা ছিল অনেক বেশি সংগঠিত, আদর্শভিত্তিক এবং ধৈর্যশীল। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও মানুষের মধ্যে একটি নৈতিক সীমারেখা ছিল। ভাষা আন্দোলনের সময় তরুণরা রাজপথে নেমেছিল মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তাদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, মুখে ছিল স্লোগান, মনে ছিল আত্মত্যাগের প্রস্তুতি।
সেই প্রতিবাদের ভাষা ছিল সাহসের, কিন্তু ঘৃণার নয়। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনে ছিল সংগঠিত রাজনৈতিক চেতনা। নব্বইয়ের আন্দোলনে বিরোধিতা ছিল তীব্র, কিন্তু সেই আন্দোলনের ভাষা ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আহবান।
তখন প্রতিবাদের বড় মাধ্যম ছিল সভা, সমাবেশ, পোস্টার, দেয়াললিখন, কবিতা, গণসংগীত কিংবা পত্রিকার কলাম। একটি রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরি হতে সময় লাগত, একটি স্লোগান মানুষের মুখে মুখে ছড়াতে সময় লাগত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন কিংবা শহরের চায়ের দোকান হয়ে উঠত রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা। মানুষ মতের বিরোধিতা করত, কিন্তু সেই বিরোধিতায় যুক্তি ও আদর্শের জায়গা ছিল।
প্রতিবাদের ভাষা তখন অনেকাংশে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গেও যুক্ত ছিল। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী—তাঁরাও প্রতিবাদের অংশ হয়ে উঠতেন। একটি কবিতা কিংবা একটি গান মানুষের মধ্যে আন্দোলনের শক্তি জাগিয়ে তুলত। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ কিংবা গণসংগীতের আহবান আন্দোলনের ভাষাকে আরো গভীর করত।
কিন্তু এখনকার বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। প্রতিবাদের বড় একটি অংশ চলে গেছে ভার্চুয়ালজগতে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা এক্স—এখন জনমত তৈরির প্রধান মাধ্যম। আগে কোনো ঘটনার প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়তে দিন কিংবা সপ্তাহ লেগে যেত; এখন কয়েক মিনিটেই একটি ভিডিও, একটি পোস্ট কিংবা একটি লাইভ লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন প্রতিবাদের ভাষাকেও বদলে দিয়েছে। এখন প্রতিবাদ আরো দ্রুত, সংক্ষিপ্ত এবং প্রতীকনির্ভর। একটি মিম, একটি ব্যঙ্গচিত্র কিংবা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও অনেক সময় দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। নতুন প্রজন্ম দীর্ঘ রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে সরাসরি ও ভিজ্যুয়াল ভাষা বেশি পছন্দ করে। ফলে প্রতিবাদেও এসেছে ব্যঙ্গ, ট্রল, ভিজ্যুয়াল আর্ট, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন এবং হ্যাশট্যাগ সংস্কৃতি।
তবে এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু প্রযুক্তি নয়, সমাজের ভেতরের হতাশাও কাজ করছে। রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রচলিত নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে মানুষ নিজের ভাষা নিজেই তৈরি করতে শুরু করে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করে, প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে তারা নিজেদের ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তাকে প্রকাশ করছে নতুনভাবে।
সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনগুলো এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। সেখানে দেখা গেছে, প্রতিবাদের ভাষা শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দেয়ালচিত্র, ব্যঙ্গ, কবিতা, নাটক কিংবা গানও আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ কার্টুন এঁকে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, কেউ ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরি করছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতীকী ছবি ব্যবহার করছে। অর্থাৎ প্রতিবাদ এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রকাশও।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। আগে প্রতিবাদের ভাষায় অনেক ক্ষেত্রে শালীনতা ও আদর্শের জায়গা ছিল। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ভাষা দ্রুত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। মতের বিরোধিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ কিংবা অপমানের দিকে চলে যাচ্ছে। মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। ফলে ভিন্নমতকে বোঝার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই প্রসঙ্গে দার্শনিক ভলতেয়ারের বহুল আলোচিত উক্তিটি আবারও মনে পড়ে : ‘আমি তোমার কথার সঙ্গে একমত না-ও হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি মৃত্যুতেও প্রস্তুত।’ একটি গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য এখানেই—ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতায়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় এখন মত প্রকাশের চেয়ে মতের প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠছে। কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে কিংবা অনলাইনে বিদ্বেষের শিকার হতে হচ্ছে।
এখানে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো প্রতিবাদের স্থায়িত্বে। আগে একটি আন্দোলন দীর্ঘ সময় ধরে চলত। সংগঠন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কাঠামো আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখত। এখন অনেক প্রতিবাদই ট্রেন্ডনির্ভর। সামাজিক মাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, কিন্তু কিছুদিন পর সেটি হারিয়ে যায় নতুন ইস্যুর ভিড়ে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও প্রতিবাদের ভাষাকে বদলে দিচ্ছে। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সামাজিক বৈষম্য, অনিশ্চয়তা—এসব মানুষের ভেতরে জমিয়ে তুলছে হতাশা। যখন মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে থাকে, তখন তাদের ভাষাও কঠিন হয়ে ওঠে। প্রতিবাদ তখন শুধু দাবির ভাষা থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণও ভাষাকে আরো তীব্র করে তুলছে। মানুষ এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ভিন্নমতের মানুষ হিসেবে নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলে প্রতিবাদের ভাষায় সহনশীলতার জায়গা কমে যাচ্ছে। যুক্তির বদলে বিদ্বেষ জায়গা করে নিচ্ছে। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবাদের ভাষা কেমন হওয়া উচিত?
প্রতিবাদ হতে হবে মানবিক। ভিন্নমতকে ঘৃণা করে নয়, বোঝার চেষ্টা করে প্রতিবাদ করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু সেই পার্থক্য যদি শত্রুতায় পরিণত হয়, তবে সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্রতিবাদ হতে হবে যুক্তিনির্ভর। প্রতিবাদে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। অন্যদিকে প্রতিবাদ হতে হবে দায়িত্বশীল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ অন্যের মর্যাদা রক্ষা করা। ঘৃণা, অপপ্রচার কিংবা সহিংসতা কখনোই সুস্থ প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। এবং প্রতিবাদকে সাংস্কৃতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সাহিত্য, গান, নাটক, শিল্প—এসব সমাজকে মানবিক করে তোলে। অতীতের আন্দোলনগুলোতে সংস্কৃতির যে শক্তি ছিল, সেটি ফিরিয়ে আনা জরুরি।