কর্মের সংস্কৃতি এগিয়ে যাক
স্বাধীনতার দীর্ঘকাল পরও দেশে কর্মের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। তাই দেখা যায়, আজও সরকারি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘১০টার অফিসে’ যায় সাড়ে ১০টা-১১টায়।
আবার দুপুর ১টা না বাজতেই শুরু হয় লাঞ্চের প্রস্তুতি। লাঞ্চ শেষ হয় আড়াইটা নাগাদ। এরপর বিকেল ৪টা না বাজতেই ঘরে ফেরার প্রস্তুতি।
এবার আসা যাক ছুটিছাটা প্রসঙ্গে।
সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক ছুটির অন্যতম হলো ক্যাজুয়াল লিভ। এই ছুটি অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনের জন্য। এই ছুটি ২০ দিন নিতেই হবে অথবা কর্তৃপক্ষকে ২০ দিন এই ছুটি দিতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু আমাদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হিসাব রাখেন এবং সে অনুযায়ী ২০ দিন ছুটি নিয়ে নেন।
এরপর আছে অর্জিত ছুটি ও মেডিক্যাল লিভ। মেডিক্যাল লিভের বেশির ভাগ হয় ভুয়া সার্টিফিকেটে, ভুয়া ঘোষণায়, এটি কমবেশি ওপেন সিক্রেট। এর চেয়েও বড় কথা অফিসে আসা-যাওয়া ও দায়িত্ববোধ। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। তা হলো কোনো এক ব্যক্তির একটি জরুরি চিঠি প্রয়োজন ফরেন অফিসের।
চিঠি তৈরিও, কিন্তু তার পরও সঙ্গে সঙ্গে না দিয়ে বলা হয় কাল আসেন। ভদ্রলোক কাল যথাসময়ে গিয়ে দেখেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নেই। কারণ তিনি অফিসে আসেননি। কেন আসেননি? খোঁজ নিয়ে জানা গেল ওয়েদার খারাপ। তাই আসতে পারেননি। বৃষ্টি-বাদলা দেখলে স্ত্রীকে বলেন, ‘দেখো তো বাইরের কী অবস্থা।’ স্ত্রী জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলেন, ‘খুব খারাপ অবস্থা। আকাশ অন্ধকার, বৃষ্টি হচ্ছে।’ এ কথা শুনেই কর্তা বলেন, ‘শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, আজ আর যাব না।’ অন্যদিকে স্ত্রীকে তাড়া দেন পুত্র-কন্যাকে স্কুলে পৌঁছে দিতে। পুত্র-কন্যাদের স্কুল কামাই হলে ওদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে—এটি সরকারি কর্তারা ভালোভাবেই বোঝেন। কিন্তু তিনি বিনা নোটিশে অফিস কামাই দিলে যে ক্ষতি হবে, তা বোঝেন না। বোঝার চেষ্টাও করেন না।
সরকারি কর্মচারীদের এই কর্মবিমুখ অবস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকে এই অবস্থার জন্ম হয়েছে। খোদ ব্রিটিশ আমলেই লেট লতিফ বলে একটি কথা চালু ছিল। এ থেকে বোঝা যায় ব্রিটিশ ভারতেও আমাদের বঙ্গসন্তানরা সরকারি অফিসে ফাঁকি দিতেন। ঔপনিবেশিক আমলে বিদেশি প্রভুদের ফাঁকি দিলেও প্রভুরা এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। কারণ তাঁরা চাইতেন সরকারি কর্মচারীরা যেন সব ধরনের বদ অভ্যাস রপ্ত করেন। তাহলেই তাঁদের লাভ। এতে তাঁরা অনেক বেশি প্রভুভক্ত থাকেন। তা ছাড়া এই শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ইংরেজ প্রভুদের তুষ্টির জন্য নানা বৈধ-অবৈধ কাজ করতেন।
সেই ঔপনিবেশিক যুগের অবসান হয়েছে আজ থেকে অনেক বছর আগে, ১৯৪৭ সালে। তারপর ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়। এই স্বাধীনতারও দীর্ঘ বছর পার হয়েছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক আজও এ দেশে কর্মের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। শুধু তা-ই নয়, এই কর্মের সংস্কৃতি গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগও নেই। উপরন্তু জাতিকে কর্মবিমুখ করার প্রচেষ্টা আছে। এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ হলো, যাঁরা এই কাজটি করবেন (মন্ত্রী-এমপি), তাঁরা নিজেরাই ঠিকমতো অফিস করেননি। কোনো মন্ত্রী সচিবালয়ে ১০টা-৫টা অফিস করেছেন এমন উদাহরণ আমার জানামতে নেই। আর এমপিদের অবস্থা আরো খারাপ। বিগত দিনগুলোতে আমরা প্রায়ই সংবাদপত্রে দেখেছি, কোরাম সংকটে সংসদ অধিবেশন হচ্ছে না সময়মতো। সময়মতো যদি সংসদ না বসে, সংসদ অধিবেশন না হয়, তাহলে কর্মের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে কী করে?