বিচ্ছিন্নতা পশ্চাৎপদতাও বটে
বিচ্ছিন্নতা যেমন সত্য, তেমনি ক্ষতিকর। মানুষ বিচ্ছিন্ন হয় নানা কারণে এবং বিভিন্নভাবে। কিন্তু বড় সত্য এটাও যে মানুষ যেহেতু প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি—দুদিক দিয়েই সামাজিক প্রাণী, তাই বিচ্ছিন্নতা তার জন্য স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকরও নয়। বিচ্ছিন্নতাকে বরং অসুখ বলা চলে; যে জন্য তার চিকিৎসা আবশ্যক, পারলে তাকে মিথ্যা করে দেওয়াই ভালো। কিন্তু কাজটা বেশ কঠিন। কোনো কোনো অবস্থায় বিচ্ছিন্নতা একেবারেই অনিবার্য হয়ে পড়ে; সেসব ক্ষেত্রে ঘটনাটিকে মানুষ বিধিলিপি হিসেবে মেনে নেয়। বিচ্ছিন্নতা ঘটে দুঃখ ও যন্ত্রণা থেকে, যা সব কালে ও স্থানেই সত্য।
বিচ্ছিন্নতা অবশ্যই সামাজিক। এই বিচ্ছিন্নতায় সমাজ ও রাষ্ট্র যুক্ত থাকে এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার কার্যকর তৎপরতা থাকে। এর হাত থেকে পরিপূর্ণ অব্যাহতি সম্ভবপর। তবে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং রাখাটা প্রয়োজনও বটে। সেটার প্রয়োজন জীবনকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার স্বার্থেই।
বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষ করে এর প্রভাব পড়েছে স্বাধীনতা ও সাম্যের ওপর। আর বিষয়টিকে বিভিন্ন ক্ষেত্র ও পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করা যায়। স্বাধীনতা ব্যক্তির মুক্তির জন্যই আবশ্যক এবং ব্যক্তির মুক্তিই হওয়া চাই সামাজিক বিকাশের উৎকর্ষ ও উপযোগিতার নিরিখে। কিন্তু ব্যক্তির বিকাশ সমষ্টির সাহায্য, সহযোগিতা ও সমর্থন ছাড়া কখনোই সম্ভব নয়।
সমষ্টির জীবনই ব্যক্তির অবস্থান এবং মানের ভেতর প্রতিফলিত হয় বলাটা মোটেই অন্যায় হবে না। কিন্তু সমষ্টির জীবনীশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি যদি নিজেকে মস্ত বড় করে তুলতে চায়। বড় গাছ তার আশপাশের ছোট গাছদের মিত্র নয়, শত্রু বটে। ব্যক্তির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি স্বৈরাচারের জন্ম দেয়; সে অন্যের জায়গা দখল করে নেয়। বাধা দেয় তাদের বৃদ্ধিকে। ফলে দেখা দেয় অনৈক্য, বিরোধ ও সংঘর্ষ; হতাশা আসে, আসে উদ্যমহীনতা—এসব কারণে পরিবেশটা হয়ে দাঁড়ায় অস্বাভাবিক।
সাম্য থাকলেই যে ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, এমনটাও অবশ্য বলা যাবে না। আদিম সাম্যবাদী সমাজের কথা আমরা জানি, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনো বোধ ছিল না, দার্শনিক রুশো যে ব্যবস্থাকে অনেকটা আদর্শায়িত করেছেন। কিন্তু আদিম সেই ব্যবস্থায় ব্যক্তি খুব একটা স্বাধীন ছিল না। জগৎ ছিল সীমাবদ্ধ, প্রকৃতি ছিল বৈরী এবং রোগের চিকিৎসা অকিঞ্চিৎকর। অনেক পরে ফরাসি বিপ্লব এবং তারপর রুশ বিপ্লবের ফলে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, নাগরিকেরা স্বাধীনতা পেয়েছিল, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিশ্বকে সব সময়ই সন্ত্রস্ত থাকতে হয়েছে পুঁজিবাদ, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বহুবিধ আগ্রাসন ও নিরন্তর অপপ্রচারের দরুন। রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাঠামোটি তো শেষ পর্যন্ত ভেঙেই পড়ল, যাতে বোঝা গেল যে সাম্য স্থানীয় হলে তার পক্ষে টেকা মুশকিল, তার হওয়া চাই আন্তর্জাতিক। এসবই সত্য; কিন্তু সত্য এটাও যে সমাজে বৈষম্য যত বাড়ে, ব্যক্তির স্বাধীনতা ততই কমে।
সাম্য থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কিন্তু না থাকলে যে ভীষণ বিপদ। সাম্য হচ্ছে সেই অদৃশ্য বন্ধন, ব্যক্তির জন্য যা নিরাপত্তা ও বিকাশের আশ্বাস জোগায়। বারণ করে দৈত্য হতে, অসম্মত হয় পতঙ্গে পরিণত করতে। সাম্য আইনের চেয়ে বড়, প্রথার তুলনায় শক্তিশালী; তাকে উপাদান হতে হয় সংস্কৃতির, অংশ হতে হয় সমাজকাঠামোর। যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ, তার ভিত্তি হওয়া চাই অধিকার ও সুযোগের সাম্য।
বৈষম্য যেখানে প্রধান সমস্যা, মানুষের দুর্দশা সেখানে যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারে, তার দৃষ্টান্ত অন্যত্র খোঁজার প্রয়োজন নেই, আমাদের নিজেদের সমাজেই অতিশয় প্রত্যক্ষরূপে তা বিদ্যমান। তথাকথিত জঙ্গিবাদ যে প্রবল হয়ে উঠেছে, তার পেছনে বিদেশি টাকা কিন্তু তার লালনের ক্ষেত্রটা হচ্ছে সামাজিক বৈষম্যজাত ক্ষোভ ও ক্রোধ। জঙ্গিরা নিজেদের বঞ্চিত ও বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখে। তারা মনে করে, তাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। তাদেরকে ঠেলে রাখা হয়েছে প্রান্তসীমায়। ফলে তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং শিক্ষা ও মেধার অভাবের দরুন হিংস্র হয়ে পড়ে। দুঃসাহসিক কাজ করে নিজেদের কেড়ে নেওয়া বীরত্বকে তারা প্রতিষ্ঠা করতে চায়—অন্যের চোখে যেমন, তেমনি নিজের চোখেও।
জঙ্গিবাদ অবশ্যই একটা রোগ, কিন্তু সে আবার একটা বড় রোগের লক্ষণও বটে। সেই বড় রোগটা হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা; সমাজে ন্যায়বিচার নেই, তাই খেপে ওঠা বিদ্যমান ব্যবস্থাটাকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে চায়; যদিও এদের মোটেই জানা নেই, কোন বিকল্পের তারা প্রতিষ্ঠা চায়, অতটা জ্ঞান-বুদ্ধি থাকলে অবশ্য এতটা বিচ্ছিন্ন হতো না, নিজেদের জীবনের অভিশাপকে নিয়ে যেতে চাইত না অন্যের জীবনে। হরতালের সময় রাস্তার টোকাইরা যেভাবে চলন্ত বাস দেখলে তাতে ঢিল ছোড়ে, জঙ্গিরাও সেভাবেই বোমাবাজি করে, যদিও তাদের ওই আবরণটা খুবই আলাদা, নইলে অনুভূতিটা বেশ নিকটবর্তী।
বিচ্ছিন্নতার কেন্দ্রে আছে ক্ষমতা থাকা না থাকার বিষয়টা। পুঁজিবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটা কাউকে কাউকে সুযোগ দেয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার; এই ক্ষমতাবানেরা নিজেদের প্রবল করে এবং অন্যদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়। ফলে বঞ্চনার বোধ দেখা দেয়। বঞ্চিতরা তো অবশ্যই, ক্ষমতাবানেরা নিজেরাও বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। ক্ষমতাহীন মানুষেরা ক্রমাগত প্রান্তিকতার দিকে এগোতে থাকে। আর ক্ষমতাবানেরাই যেহেতু আদর্শ হয়ে বিদ্যমান রয়ে যায়, তাদের দৃষ্টান্ত তাই অন্য সবাই অনুসরণ করতে থাকে। এই আদর্শবাদিতার পথ ধরে এগোতে গিয়ে আমাদের সমাজে দেখা যায়, মানুষ নিজেকে শুধুই অমানুষ করে তুলছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিচ্ছিন্নতা
- পিছিয়ে পড়া