ঢাকা উত্তরে চাঁদা নেওয়ার লোক পাল্টেছে, ‘অদৃশ্য শক্তির’ বাধাও আছে
মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ আবাসিক এলাকায় প্রতি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ময়লার বিল নেওয়া হয় ১৫০ টাকা, যা গত ডিসেম্বরেও ছিল ১০০ টাকা। লালমাটিয়ায় কোথাও নেওয়া হয় ২৫০ টাকা, কোথাও ৩০০ টাকা। মিরপুরের বিভিন্ন সেকশনে ফ্ল্যাট প্রতি ১০০–১৫০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। শেওড়াপাড়ায় প্রতি ফ্ল্যাটের জন্য দিতে হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
অন্যদিকে গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় ময়লার বিলের পরিমাণ আরও বেশি। এসব এলাকার বড় হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকদের মাসে দিতে হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। ঢাকা উত্তর সিটির একেক এলাকায় এই বিল একেক রকমের। যদিও সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ময়লার বিল মাসে ১০০ টাকার বেশি হবে না। কিন্তু যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই বিল আদায় করছে।
ঢাকা উত্তর সিটিতে ওয়ার্ড আছে ৫৪টি। এর মধ্যে ১ থেকে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন নির্ধারিত মাসিক ফি ১০০ টাকা। বাকি ১৮টি ওয়ার্ডের (৩৭-৫৪) ক্ষেত্রে ৫০ টাকা। এসব ওয়ার্ড (উত্তরখান-দক্ষিণখান, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকা) ২০১৬ সালের জুন মাসে সিটি করপোরেশনে যুক্ত হয়। নতুন ওয়ার্ডগুলোতেও বাসাবাড়ির ময়লার বিল ৫০ টাকার বেশি নেওয়া হয়। যেমন দক্ষিণখানে (৪৮ নম্বর ওয়ার্ড) নেওয়া হয় মাসে ১৫০-২০০ টাকা। আবার ভাটারার বারোবিঘা এলাকায় (৪০ নম্বর ওয়ার্ড) ফ্ল্যাটপ্রতি নেওয়া হয় ১০০ টাকা।
বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি কীভাবে হয়, কোন এলাকায় কত টাকা বিল নেওয়া হয়, কারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত, রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা কতটা আছে—এসব বিষয়ে জানতে গত ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত ২১ দিন ঢাকা উত্তর সিটির ২৬টি ওয়ার্ড ঘুরেছেন এই প্রতিবেদক। এই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, সিটি করপোরেশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, ময়লা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত কর্মী ও ভ্যানচালকদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। এ ছাড়া ২৬টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে অন্তত দুজন করে বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক।
অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে ইচ্ছেমতো ময়লার বিল আদায়ের বিষয়ে অবগত আছেন বলে প্রথম আলোকে জানান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, কারও কাছ থেকে অভিযোগ পেলে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন তিনি।
প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, যে যার মতো করে পেশিশক্তির মাধ্যমে হোক বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে হোক, একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সিটি করপোরেশনের আওতায় নিয়ম ও শর্ত মেনে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি শুরু করা গেলে বিশৃঙ্খলা কমে আসবে। বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ করার বিষয়টি নিয়ে আদালতে একটি পক্ষ রিট করেছে। রিটকারী পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। তখন ময়লা সংগ্রহের কাজটি একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি করা গেলে বিশৃঙ্খলা থাকবে না।
আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের শাসনামলে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ করতেন দলটির নেতা-কর্মীসহ তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। এ নিয়ে ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘রাজধানীতে ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা-বাণিজ্য’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীবাসীকে জিম্মি করে বছরে অন্তত ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা-বাণিজ্য করছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় কাউন্সিলরদের লোকজন। সেদিন প্রথম পাতার পাশাপাশি ভেতরের পাতাতেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এসব প্রতিবেদনেও ময়লা-বাণিজ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে।