জীবনব্যাপী শিক্ষাজট কি চলতেই থাকবে

প্রথম আলো সৌমিত জয়দ্বীপ প্রকাশিত: ০৬ মে ২০২৬, ১০:৫১

অভিনয়শিল্পী বিপাশা হায়াত নববর্ষের আগে একটি মিডিয়াকে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেশনজটের কারণে মাস্টার্সসহ চারুকলায় তাঁদের ১২ বছর পড়তে হয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এককালে এমনই ছিল!


বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতে আমরা এ ব্যবস্থাকে বলতাম ‘সেশনজট’। কিন্তু শেষে বুঝেছিলাম, এটা প্রকৃতপক্ষে ‘শিক্ষাজট’! বুঝেছিলাম, এরই নাম অচলায়তনিক ব্যবস্থা, যা আমলতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার মতো বিদ্যায়তনেও হুবহু বলবৎ থাকে।


সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এই জটের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তির তাক করেছেন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার দিকে। সেই সূত্রে কোচিং ব্যবসারও রাশ টানতে চেয়েছেন। অত্যন্ত ইতিবাচক ব্যাপার। এই দুই পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষাবর্ষের মধ্যে নেওয়ার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সমর্থনযোগ্য। তবে সার্বিকভাবে সমস্যাটিকে আরও বিশদে দেখার সুযোগ আছে।


শিক্ষাজট: প্রাক্‌-প্রাথমিক


আমরা বিদ্যার্জনকে মূলত শিক্ষার হাতে সোপর্দ করেছি। ‘শিক্ষা দেওয়ার’ নামে শিশুমনে আনন্দের বদলে সৃষ্টি করেছি অন্তর্জ্বালা ও ভীতি। সেটাই প্রকৃতপক্ষে হয়ে উঠেছে ‘উচিত শিক্ষা’, বিদ্যার্জন থেকে যার যোজন দূরত্ব।


এই প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রাক্‌-প্রাথমিকে। বিশেষত বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোয়। এই বিদ্যালয়গুলো সব আমলেই সরকারি ‘নজরদারি’র বাইরে থাকে। তারা প্রাক্‌-প্রাথমিকে নিজেদের মর্জিমাফিক যে পাঠ্যক্রম পড়ায়, তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্তত তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ানোর সমানুপাতিক। প্রাক্‌-প্রাথমিকের নামে শিশুর মানসিক বিকাশবিরোধী এই পুস্তকচাপ অভাবনীয় অপরাধের সমান।


এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুরা প্রথম শ্রেণিতে ওঠার আগেই মোটামুটি তিনটি শ্রেণিতে পড়ে। বইয়ের ভারে শিশুর ঝোলা তো ঝুলেই, শরীরটাও হেলে পড়ে! আদতে এগুলো শিক্ষা নয়, শিক্ষাব্যবসার বন্দোবস্ত। এ বন্দোবস্ত শিশুর মানসিক বিকাশে কোনো সাহায্য করে না; বরং প্রারম্ভেই শিক্ষাকে একটি ভীতিকর বিষবৃক্ষে পরিণত করে।


প্রাক্‌-প্রাথমিক মূলত শিশুর চিত্তবিনোদন ও পরিবার থেকে সামাজিক পরিসরে পদার্পণ করতে শেখার প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য হয়, যার সঙ্গে প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা চাপের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশংসনীয় কাজ করছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। প্রাক্‌-প্রাথমিক শিশুদের কোনো চাপই নেই। তারা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করে ছয় বছর বয়সে, প্রথম শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য সহজপাঠ্যে। সরকার প্রণীত পাঠ্যক্রম ও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ বিদ্যালয়গুলোয় আদতেই শিশুযোগ্য করে তুলেছে।


অথচ বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো গেছে উল্টো পথে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক পুস্তকের ভারে তারা শৈশবের আনন্দকে ভূলুণ্ঠিত করছে। কারণ, তাদের আছে শিক্ষাব্যবসার উন্নততর প্রকৌশল। শিশুর ওপর যত চাপ, শিক্ষাব্যবসায়ীদের তত বৈষয়িক লাভ—কোচিং ব্যবসার উন্মুক্ত দ্বার! অভিভাবকদেরও সেটাই পছন্দ বৈকি!


আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরুর আগে প্রাক্‌-প্রাথমিকের আদর্শবিরোধী এই বাংলাদেশি সংস্করণকে ‘প্রাক্‌-শিক্ষাজট’ বলা উচিত। কারণ, জীবনের এ সময়টিতে যা করণীয়, তা করতে আমরা শিশুদের বাধা দিচ্ছি এবং বিপরীতে ‘উপহার’ দিচ্ছি পুস্তকের বোঝা। সময়ের এই অনভিপ্রেত অপচয় তাই অনিবার্যভাবেই একটি শিক্ষাজট। উচ্চ শ্রেণির পাশাপাশি এই ব্যবসাভিত্তিক প্রাক্‌-শিক্ষাজট নিরসনকল্পেও শিক্ষাকর্তাদের আশু পদক্ষেপ প্রয়োজন।


মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক


প্রাক্‌-শিক্ষাজটে জীবনের প্রথম দুই-তিন বছর বিনষ্ট হওয়ার পর সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে নবম থেকে ত্রয়োদশ শ্রেণির মধ্যবর্তী সময়ে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাবর্ষ মূলত বর্ষপঞ্জি অনুসারী। অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এক শিক্ষাবর্ষ। এ হিসাবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষাকাল চতুর্বর্ষে সম্পন্ন হওয়ার কথা। অথচ বর্তমান ব্যবস্থায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হচ্ছে নিজস্ব শিক্ষাবর্ষের বাইরে, যে সময়টা মূলত উচ্চতর স্তরের জন্য বরাদ্দকৃত।


নতুন সহস্রাব্দে গ্রেডিং পদ্ধতির প্রায় শুরুর দিকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম আমরা। পরীক্ষা হলো মার্চ মাসে, ফল পেলাম জুন মাসে। উচ্চমাধ্যমিকের ক্লাস শুরু হলো সেপ্টেম্বর মাসে। মানে ব্যবস্থার ত্রুটিতে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ৯ মাস তত দিনে শেষ হয়ে গেছে।


এ হিসাবে, বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিকের দুই বর্ষ শেষ করতে হাতে সময় ছিল মাত্র ১৫ মাস। কিন্তু ব্যবস্থা-প্রণীত শুভংকরের ফাঁকির সুযোগে আমরা পরীক্ষা দিলাম ক্লাস শুরু হওয়ার ২০ মাস পর, মে-জুন মাসে। ফল প্রকাশ হলো সেপ্টেম্বর মাসে। তত দিনে ত্রয়োদশ শ্রেণি তথা স্নাতক প্রথম বর্ষের খাত থেকে তিন মাস চলে গেছে।


ইতিবাচক ভাবুকেরা অবশ্য বলবেন, ক্লাস শুরু থেকে ফল পাওয়া—কী চমৎকারভাবেই না ঠিকঠাক ২৪ মাসের মধ্যে আমরা উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে গেলাম! অথচ তাঁরা ভেবে দেখবেন না, সেকালে মাধ্যমিকের ১১টি বিষয়ের (বাংলা-ইংরেজি দুই পর্ব মিলিয়ে) একই পুস্তক পড়ে পরীক্ষা দিতে ২৭ মাস লাগলেও উচ্চমাধ্যমিকের দুই বর্ষে ছয়টি বিষয়ের মোট ১২টি স্বতন্ত্র পর্ব এবং দ্বিগুণ আয়তনের অধিকতর কঠিন সিলেবাস শেষ করতে হয়েছিল মাত্র ২০ মাসে!


ভর্তিযুদ্ধ শেষে স্নাতক প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হলো মার্চ মাসে। তত দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই-জুন শিক্ষাবর্ষের হিসাব থেকে মোট ৯ মাস অস্তাগত। সর্বসাকল্যে নবম থেকে ত্রয়োদশ শ্রেণির ক্লাস শুরুর আগে ৪৮ মাসের পরিবর্তে উত্তরণকাল (ট্রানজিশন পিরিয়ড) সাপেক্ষে আমাদের গেছে ৬৩ মাস। ব্যবস্থার বদৌলতে কালক্ষেপণ ১৫ মাস!  


অথচ মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক নির্ধারিত চার পঞ্জিকাবর্ষে শেষ করতে পারলে, ব্যবস্থার ফাঁক গলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শ্রেণির ভর্তি ও ক্লাস শুরুর জন্য অন্তত ছয় মাস সময় হাতে থাকার কথা। সেটা আজ পর্যন্ত আমরা রক্ষা করতে পারিনি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও