বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান কতদূর

দেশ রূপান্তর সুবাইল বিন আলম প্রকাশিত: ০৩ মে ২০২৬, ১১:২২

বাংলাদেশে কাগজে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। সরকারি হিসাবে, এখন ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো।  দক্ষিণ এশিয়ায় গড় বিদ্যুৎ ঘাটতি ৫ থেকে ৭ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় তিনগুণ বেশি। প্রশ্ন হলো, এত সক্ষমতা থাকতে বিদ্যুৎ নেই কেন? উত্তরটা উৎপাদনে নয়, সিদ্ধান্তে। গত ১৫ বছর রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ না বানালেও, ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। ২০০৮-০৯ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ গেছে, ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সেই চার্জ ছিল ২৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছিল মাত্র ৩.৭ শতাংশ, চার্জ বেড়েছিল ৫৬ শতাংশ।


বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই সংখ্যা ৪২ হাজার কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এই টাকায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ বসানো যেত অথবা পুরো জাতীয় গ্রিড আধুনিক করা যেত কিংবা দুই থেকে তিনটি বড় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা যেত। বাংলাদেশে ক্যাপাসিটির ইউটিলাইজেশন বর্তমানে প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মান ৭৫-৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেক সময় কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকে। আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ১৫-২০% ‘স্পিনিং রিজার্ভ’ রাখা হয়।  কিন্তু বাংলাদেশে সক্ষমতা চাহিদার তুলনায়, প্রায় ৪৫-৫০% বেশি, যা দক্ষতার নয়, বরং পরিকল্পনার ব্যর্থতার ইঙ্গিত। আমরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাওয়ার প্ল্যান্টে বিনিয়োগ করে ঋণ বাড়িয়েছি, বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে। আমাদের প্রতি ইউনিট গড় জেনারেশন খরচ ১২ টাকার ওপরে। কিন্তু সরকার এক পল্লী বিদ্যুৎকেই ভর্তুকি দেয় প্রতি ইউনিটে ৫ টাকার বেশি।


দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে, এলএনজি আমদানি নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে গোটা খাতকে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। সেই এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতার ৪০-৫০% ব্যবহার হচ্ছে। বাকি কেন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে, জ্বালানি নেই। টার্মিনাল নষ্ট থাকলে, পুরো সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়ে যায়। ভাবা যায়, এমনই ভঙ্গুর ব্যবস্থায় দেশকে নির্ভরশীল করা হয়েছে! উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম। ফলে গ্রিড ট্রিপের ভয়ে, উৎপাদিত বিদ্যুৎও মাঝে মাঝে জাতীয় গ্রিডে নেওয়া সম্ভব হয় না। এক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রই চালু হতে এক বছর পিছিয়ে গেছে, যাতে অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকার মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সিস্টেম লস বর্তমানে এক অঙ্কে নেমে এলেও, অবৈধ সংযোগ এবং জরাজীর্ণ বিতরণ লাইনের কারণে যে ৫-৮% বিদ্যুৎ নষ্ট হয়, তার আর্থিক মূল্য বছরে ৮-১০ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে  বৈশ্বিক উত্তেজনা।


ইরান সংকটে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে যাওয়া  বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়লে, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশ সরাসরি আঘাত পায়। মার্চ ২০২৬-এ বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত সংশ্লিষ্ট জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায়,  বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে প্রায় ২০০ কোটি ডলার ঋণ নিতে হয়েছে। বকেয়ার সংখ্যাটা আরও ভয়াবহ। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট বকেয়া ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। বকেয়া বিলের একটি বড় অংশই হলো বিদেশি কোম্পানিগুলোর পাওনা, যা পরিশোধ করতে না পারায় দেশের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪৮% বেশি, অথচ আন্তর্জাতিক মান ১৫-২০%। এই অতিরিক্ত সক্ষমতা আসলে অদক্ষ বিনিয়োগের প্রতিফলন। জ্বালানি কেনার টাকা নেই, ফলে বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু পাওয়ার প্ল্যান্ট বসে গেছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে নতুন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থনীতিতে এর প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান।


গাজীপুরে প্রায় ৫ হাজার শিল্পকারখানায় প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ক্রয়াদেশ ভারতে চলে যাচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। পোশাক খাতের অর্ডার ভারত বা ভিয়েতনামে চলে যাওয়ার ফলে শুধু যে ডলার আয় কমছে তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আমরা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে আমাদের নির্ভরযোগ্যতা হারাচ্ছি। শুধু পোশাক নয়, সিরামিক, ইঞ্জিনিয়ারিং, ওষুধ খাতও ক্ষতিগ্রস্ত। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্পে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় আধা শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছে। এডিবি ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যার অন্যতম কারণ হিসেবে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতজনিত সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন ও জ্বালানি সংকটের কথা বলা হয়েছে। বর্তমান সরকার এই ফাঁদটা তৈরি করেনি। কিন্তু এটা থেকে বের হওয়ার দায়িত্ব তাদেরই। আর এজন্য দরকার কেবল সদিচ্ছা নয় দরকার দক্ষতা এবং প্রচণ্ড রাজনৈতিক সাহস। পথ একটা নয়, কয়েকটা একসঙ্গে নিতে হবে।


প্রথমত, দেশীয় কয়লা উত্তোলন ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র পূর্ণমাত্রায় চালু করা। বড়পুকুরিয়া, পায়রা ও রামপাল কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চললে আমদানিনির্ভরতা স্বল্পমেয়াদে উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।  দ্বিতীয়ত, বায়োফুয়েল ও কৃষিবর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ। ধানের তুষ, আখের ছোবড়া, পৌর বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও বায়োফুয়েল উৎপাদন সম্ভব। গ্রামীণ পর্যায়ে গ্রিডের চাপ কমানোর এটি একটি কার্যকর পথ।  তৃতীয়ত, বকেয়া আদায়ে কঠোর অবস্থান। সরকারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া সরাসরি বাজেট থেকে কেটে নেওয়ার নীতি না হলে ৫২ হাজার কোটির এই বোঝা আরও বাড়বে। ভর্তুকি আস্তে আস্তে কমিয়ে আনতে হবে। চতুর্থত, সোলার ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে জোরালো বিনিয়োগ। শিল্পকারখানায় নিজস্ব সোলার বাধ্যতামূলক করা এবং জাতীয় ব্যাটারি স্টোরেজ নীতিমালা গ্রহণ করা। এনার্জি মিক্স অপ্টিমাইজেশনে সোলার ব্যবহার বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে গড় উৎপাদন খরচ নামিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে মোট সক্ষমতার মাত্র ৫-৬% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। এই জন্য ডিউটি, ট্যাক্স বা ভ্যাট ছাড় শুধু নয়, সহজ শর্তে সফট লোনে ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, জাতীয় এনার্জি সাশ্রয় নীতি। শিল্প খাতে শক্তি সাশ্রয়ী মোটর (আই ই ৩/৪) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, এলইডি বাল্ব ও দক্ষ যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি এবং শিল্পে এনার্জি অডিটের মাধ্যমে চাহিদা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমানো সম্ভব। এনার্জি সাশ্রয় শুধু সরকারের কাজ নয়, এটা প্রতিটি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।


জার্মানির সবাই চেষ্টা করে ২০ শতাংশ জ্বালানি খরচ কমিয়ে ফেলেছিল।  ষষ্ঠত, নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন। আঞ্চলিক সহযোগিতায় এটি দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথ।  সপ্তমত, অদক্ষ ও মেয়াদোত্তীর্ণ রেন্টাল চুক্তি বাতিল। প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ যাচ্ছে। এই অপচয় বন্ধ না হলে নতুন বিনিয়োগের জন্য অর্থ থাকবে না। অষ্টমত, ভোলার আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত মূল ভূখণ্ডের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছানো বা সেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। নতুন গ্যাস ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে, সমুদ্রের ব্লকগুলাতে জোরদারভাবে খুঁজতে হবে।  নবমত, পুরনো ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আধুনিক কম্বাইন্ড সাইকেল প্ল্যান্টে রূপান্তর করা। হিট রেট বেশি থাকা কেন্দ্রগুলো একই জ¦ালানিতে অনেক কম বিদ্যুৎ বানায় এই অপচয় বন্ধ করতে টেকনিক্যাল অডিট জরুরি। দশমত, পাওয়ার গ্রিড আধুনিক না করে উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো অনেকটা সরু পাইপ দিয়ে বিশাল দীঘির জল সরানোর চেষ্টার মতো; সক্ষমতা থাকলেও তা গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছাবে না। একাদশ, সরকারি দল, বিরোধী দল, সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গবেষক এবং বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞসহ একটা টাস্কফোর্স গঠন করে সবাই মিলে এই সমস্যা মোকাবিলা করা উচিত।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও