ইরান যুদ্ধ কি রাশিয়ার জন্য শাপে বর
ইরান যুদ্ধ গত মঙ্গলবার দুই মাসে গড়িয়েছে। দৃশ্যত এখন পাল্টাপাল্টি হামলা না চললেও উত্তেজনা কমেনি বিন্দুমাত্র। দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পাকিস্তানের উদ্যোগ থমকে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলা চলে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন।
দুই পক্ষের অনড় অবস্থান জটিল পরিস্থিতিকে আরও জটিল আর অনিশ্চিত করে তুলেছে। মোটাদাগে এই যুদ্ধে জয়-পরাজয় এখনো যেমন নির্ধারিত হয়নি, সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব কি না, তা-ও অনিশ্চিত। তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায়, ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিজয়ী যদি কেউ হয়ে থাকে, তার নাম রাশিয়া।
ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে চার বছরের বেশি সময় হলো। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরির আগপর্যন্ত গত চার বছর এই যুদ্ধেই পুরো বিশ্বের নজর ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইউক্রেনকে দিয়ে রাশিয়াকে একহাত নেওয়ার চেষ্টায় মগ্ন ছিল এই বছরগুলোয়। অপরদিকে ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর অভিযানও চলছিল সমান গতিতে। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিশ্বের মনোযোগ ঘুরে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। তেল-গ্যাস সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। তা নিয়ে জেরবার সারা দুনিয়ার মানুষের। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ আর আলোচনায় নেই।
এই বিষয়টি নিঃসন্দেহে রাশিয়াকে বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। ‘প্রকাশ্য দিবালোকে’ তারা এখন ইউক্রেনে যা-ই করছে, তার সবই থেকে যাচ্ছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। ইরান যুদ্ধে রাশিয়ার আরও একটি বড় অর্জন রয়েছে, এবং তা যুদ্ধ যত দিন চলবে, তত দিন অব্যাহত থাকবে। তা হলো অর্থনৈতিক মুনাফা। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা বাধ্য হয়ে রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার থেকে বড় মুনাফা লুফে নিচ্ছে রাশিয়া। এতে তার অর্থনীতি যেমন শক্ত ভিত পাচ্ছে, একই সঙ্গে তা ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ এনে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, চলতি এপ্রিলেই তেল থেকে রাশিয়ার রাজস্ব আয় বেড়ে দ্বিগুণ হতে পারে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই রাশিয়া তেল থেকে দিনে আয় করেছে প্রায় ৫৯ কোটি মার্কিন ডলার করে। সে হিসাবে দেশটির মাসিক আনুমানিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৯০০ কোটি ডলার। তেলের উচ্চ দর যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে রাশিয়ার মোটের ওপর আয় হতে পারে ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মতো।
শুধু ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ সরে যাওয়া এবং তেলের বাজার থেকে আর্থিক মুনাফার কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলেও এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিজয়ী রাশিয়া। তবে এতেই শেষ নয়। রাজনীতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানাভাবে খবর প্রকাশ হয়েছে যে রাশিয়া কোনো না কোনোভাবে ইরানকে সহযোগিতা দিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ ড্রোন বহরে যেমন ইরানি ড্রোন ছিল, একইভাবে ইরান যুদ্ধে যে রুশ কোনো প্রযুক্তি কিংবা সমরাস্ত্র নেই, তা কে বলতে পারে? যদিও কোনো পক্ষই বিষয়টি স্বীকার করেনি, তাই সোজাসাপ্টা এই দাবি করাও যাচ্ছে না।
তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা কিছুটা হলেও বিষয়টির ইঙ্গিত দেয়। ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফার আলোচনার আয়োজনের মধ্যেই তা ভেস্তে যায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ছুটে গেছেন মস্কো। আর তাঁর ইসলামাবাদ ত্যাগের খবর পেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রতিনিধিদের সফর বাতিল করে দিয়েছেন। আরাঘচির মস্কো সফরের বড় একটি কারণ যুদ্ধের রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ কথা অনস্বীকার্য যে এই যুদ্ধে দুই পক্ষই ব্যাপক সমরাস্ত্রের ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের ব্যবহার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার অর্ধেক খরচ করে ফেলেছে ইরান যুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রেরই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে ইরানের কী অবস্থা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যুদ্ধ শুরুর পরই তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন মিত্রদের ভূখণ্ডে উপর্যুপরি ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ফলে তারও সমরাস্ত্রের ভান্ডারে টান পড়েছে। সেই অনটন কাটাতেই আরাঘচির মস্কো সফর।