ইরান যুদ্ধ: ভুলের পর ভুল করে ট্রাম্প যে মূল্য দিচ্ছেন
আলেকজান্ডার পোপ একসময় বলেছিলেন, ভুল করা মানুষের স্বভাব। কথাটি সত্য, কারণ, মানুষমাত্রই ভুল করে। তবে বাস্তবতা হলো, সবাই সমানভাবে ভুল করে না; কেউ কেউ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ভুলপ্রবণ। এ বাস্তবতাই গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে। কারণ, গণতন্ত্রে বড় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় আলোচনা, বিতর্ক ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
ইতিহাসে আমরা দেখেছি, স্বৈরশাসন বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনে এমন বহু নেতা ছিলেন, যাঁদের ভুল শুধু তাঁদের নিজেদের নয়, পুরো সমাজের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুতর সিদ্ধান্ত হলো অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা–ও নিজের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রয়োজনীয় আলোচনা ও ভারসাম্য রক্ষা না করেই। প্রাচীন রাজাদের মতো আচরণ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক বাধা কার্যত দেখা যাচ্ছে না এবং তাঁর চারপাশে এমন লোকজন রয়েছেন, যাঁরা কেবল তাঁর মনমতো কথাই বলেন।
এই যুদ্ধ কত দিন চলবে আর কত মানুষের জীবন কেড়ে নেবে, তা কেউ জানে না। তবু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বড় ধরনের কোনো প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না। মানুষ যেন ট্রাম্পের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আইনের শাসন উপেক্ষার ঘটনাগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। একের পর এক নতুন ঘটনার চাপে সমাজ যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও, যেখানে সাধারণত প্রতিবাদ ও ভিন্নমতের চর্চা হয়, সেখানে এখন ভয়ের পরিবেশ।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রতিবাদ করলে ভিসা বাতিল হতে পারে, দেশ থেকে বহিষ্কৃত হতে পারেন, এমনকি আইনি তদন্তের মুখেও পড়তে হতে পারে। এগুলো স্বৈরশাসিত ব্যবস্থার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিল দেখিয়ে দেয়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধের প্রভাব কী হবে—এ প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ। এর সহজ উত্তর হলো, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষতিও তত বাড়বে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তেল-গ্যাস উৎপাদন অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, যা পুনর্গঠনে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। শুধু জ্বালানি নয়, সার উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সংকট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মভিত্তিক কাঠামোর অবক্ষয়সংক্রান্ত আগের একাধিক ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও চাপের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার আগে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার পথে ছিল, যদিও তা তখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাঙ্ক্ষিত ২ শতাংশ লক্ষ্যের ওপরে ছিল। কিন্তু শুল্কনীতির কারণে সেই কমার প্রবণতা থেমে যায় এবং এখন আবার বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করেছে।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয় সুদের হার বাড়াতে পারে, নয়তো কমানোর গতি কমিয়ে দিতে পারে। ফলে বাড়ি কেনা বা ঋণ শোধ করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এমনিতেই ট্রাম্পের অস্থির বাণিজ্য, অভিবাসন ও রাজস্বনীতির কারণে চাপে রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ কিছুটা প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে, যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জোগান দিচ্ছে। এটি না থাকলে অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ত। অন্যদিকে ধনী ব্যক্তি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য কর কমানোর ফলে সরকারের হাতে সংকট মোকাবিলার আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানো বা প্রযুক্তি খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে।