মেধাবীর মৃত্যুতে শুধু পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি
সম্প্রতি কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যার ঘটনা আমাদের শোকাহত করেছে। প্রায়ই এমন ঘটনা বাকরুদ্ধ করে তোলে। ক্রমাগত এমন ঘটনা আমাদের বেশকিছু উপলব্ধির সুযোগ করে দেয়। একটা কঠিন সত্য হৃদয়কে নাড়া দেয়।
একজন মানুষের হত্যা বা মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং অর্থনীতির জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে যখন সেই মানুষটি শিক্ষিত, মেধাবী, দায়িত্বশীল এবং রাষ্ট্রীয় কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পথে থাকেন, তখন তার মৃত্যু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় ক্ষতিতে পরিণত হয়।
বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করার জন্য বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। আপনাদের অনেকেরই মনে থাকতে পারে বেশ কয়েক বছরে আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুস্তম, আবাসিক হলে নিজের কক্ষে দুর্বৃত্তের হাতে নিহত হয়েছিল। রুস্তম আমার বিভাগের এবং আমার সরাসরি ছাত্র ছিল।
আমার প্রিয় ছাত্র রুস্তমের মরদেহ দাফন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্ন এবং বাস্তবতা আমাদের গ্রাস করেছিল। আমি, বিভাগের আরও একজন শিক্ষক এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের একজন আবাসিক শিক্ষক মিলে প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থীসহ নিহত ছাত্র রুস্তমের লাশ নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি গেলাম ঘটনার দিন রাতেই।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার চকনারায়ণ গ্রামে তার বাড়ি। সেখানে আমরা পৌঁছালাম রাত ২.১৫ মিনিটে। মরদেহ পৌঁছানোর সাথে সাথে কী এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য! ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হতদরিদ্র পিতা-মাতার দ্বিতীয় পুত্র রুস্তমের অনার্স পরীক্ষা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছিল। আর কয়েকটা দিন পরেই সে অনার্স ডিগ্রিটা হাতে পেয়ে যেত।
পিতা-মাতার দীর্ঘদিনের অভাব মেটানোর সাধ্যটিও প্রায় তার হাতের নাগালেই চলে এসেছিল। কিন্তু শেষ হলো না তার কাঙ্ক্ষিত যাত্রা। ভেঙে গেল বাবা-মায়ের তিল তিল করে গড়ে তোলা দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। রুস্তমের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, সেখানে একটিমাত্র ঘর। আর সাথে এটিও জানলাম যে, ওই একটি ঘরই তার পরিবারের শেষ সম্বল।
নেই কোনো জায়গা-জমি কিংবা অন্য কোনো সম্পদ। যতটুকু জমি-জমা ছিল তাও বিক্রি করে রুস্তমের পড়াশোনার পেছনে খরচ করেছিল তারা পিতা-মাতা। আমার সাথে যাওয়া বিভাগের শিক্ষার্থীরা আমাকে বারবারই অনুরোধ করছিল, রুস্তমের বাবা-মাকে সান্ত্বনা জোগাতে। কিন্তু আমার কোনো ভাষা জানা ছিল না সান্ত্বনা জানানোর।
একজন সন্তান যখন দীর্ঘসময় পড়াশোনা শেষ করে সংসারের হাল ধরার প্রস্তুতি নেয়, বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন তার জীবন শুধু তার নিজের থাকে না। তিনি হয়ে ওঠেন একটি পরিবারের আশা, সমাজের সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্রের বিনিয়োগের ফল। রুস্তম বেঁচে থাকলে আজ সে তার বাবা-মায়ের যেমন সম্পদে পরিণত হতো ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের অন্যতম সম্পদে রূপ নিত। রুস্তমকে গড়ে তুলতে তাদের পরিবারের যেমন বিনিয়োগ ছিল, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রেরও বিনিয়োগ ছিল।
- ট্যাগ:
- মতামত
- হত্যাকাণ্ড
- কাস্টমস কর্মকর্তা