এসএমই খাত : অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় চালিকাশক্তি
শ্রমঘন এসএমই খাত (ছোট ও মাঝারি শিল্প) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। নতুন উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ, জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেট পরিকল্পনা করছে। যেখানে রাজস্ব আয়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই, আমাদের দেশের শিল্প খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ এসএমই হওয়া সত্ত্বেও জিডিপিতে তাদের অবদান মাত্র ২৫ শতাংশের কাছাকাছি।
পরিসংখ্যান বলছে, ইন্দোনেশিয়ার জিডিপিতে এসএমই খাতের ৫৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৫৮ শতাংশ, কম্বোডিয়ায় ৫৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানে জিডিপিতে এই খাতের অবদান ৪০ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে এসএমই খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে মাত্র ৫৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আর সে কারণে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ঋণ-নির্ভর বাজেট বেসরকারি খাতকে চাপে ফেলতে পারে, তাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বার্থে রক্ষায় বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন। অবশ্য ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এসএমই খাতের মন্থর গতির পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো এই খাতের জন্য প্রণীত নীতিমালা। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আজও এই খাতের একটি ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন সম্ভব হয়নি।
অথচ, বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের মোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত এবং মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ এ খাকেই পূরণ হয়। গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে শহুরে উদ্যোগ সবখানেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রাণচাঞ্চল্য দৃশ্যমান। অথচ বাজেট প্রণয়নের সময় এই খাতটি প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায় না, বরং নানাভাবে বঞ্চিত হয়। বলা যায়, তা অবহেলার শিকার হয়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কৃপা দৃষ্টি এই খাতটি কেন আকর্ষণ করতে পারে না- তা এক বিরাট প্রশ্ন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে তাই ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ, দেশের অর্থনীতিতে ৯০ শতাংশের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসএমই খাতের আওতাভুক্ত হলেও জিডিপিতে তাদের অবদান কম, যা বাড়ানোর জন্য বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তাদের স্বার্থে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি।
সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা : ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তারা সাধারণত স্বল্প পুঁজির অধিকারী হয়ে থাকে। তাই তাদের সহয়াতার জন্য কম সুদে ও সহজ শর্তে এবং জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ভোগেন অর্থায়ন সংকটে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কঠোর শর্ত, জামানতের অভাব এবং উচ্চ সুদের হার অনেক উদ্যোক্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ থেকে দূরে রাখে। ফলে তারা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যা তাদের ব্যবসার টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা। বাজেটে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা তহবিল বৃদ্ধি, সুদ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং জামানতবিহীন ঋণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
কর ও ভ্যাট ছাড় : ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর থেকে করের বোঝা কমানো এবং ভ্যাট নিবন্ধনে সহজীকরণ, কর কাঠামোকে আরও সহনশীল ও উদ্যোক্তাবান্ধব করার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় রাখতে হবে। বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা করব্যবস্থার জটিলতা ও উচ্চ হারের কারণে আনুষ্ঠানিক খাতে আসতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাজেটে টার্নওভার ট্যাক্স কমানো, কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর অবকাশ (tax holiday) প্রদান করা হলে উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা : ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে আধুনিকায়ন এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়ন সহায়ক বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছেন। সরকার যদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারে সহায়তা বাড়ায়, তাহলে এই খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- এসএমই খাত
- অর্থনৈতিক বিপর্যয়