পয়লা বৈশাখ: সংকোচনের বিপরীতে অসংকোচের শক্তি

www.ajkerpatrika.com মামুনুর রশীদ প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৬

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, বিশেষ করে যারা অনির্বাচিত শাসক গোষ্ঠী। আমাদের সংস্কৃতিতে সংকোচনের নীতি অনেক শাসকই গ্রহণ করেছে। নিজের মতো করে একটা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। দেশভাগের পর থেকেই জিন্নাহর এই আকাঙ্ক্ষা শুরু হয়।


তারপর একনায়ক আইয়ুব খান ও তাঁর অনুচর মোনায়েম খান একই পথ অনুসরণ করে রবীন্দ্রনাথকে গণমাধ্যম থেকে নির্বাসন দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন আইয়ুব সরকারের মন্ত্রী খাজা সাহবুদ্দিন। কিন্তু কী ঘটল সেখানে, সাড়ম্বরে রবীন্দ্রশতবার্ষিকী পালিত হলো। রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের প্রভাতি অনুষ্ঠানের সূচনা হলো। সারা ষাটের দশক ধরে বাঙালি তার স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও সূচনা করল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও ছোট-বড় নানা ধরনের প্রচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাগুলো সফল হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে একধরনের নতুন ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা চালু হয়। আমাদের প্রবহমান সংস্কৃতিকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ করে কাওয়ালিভিত্তিক সংস্কৃতি চালু করার চেষ্টা হয়েছিল। নাটক, সংগীত, চারুকলা, আবৃত্তি সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে কোথা থেকে একটা হাওয়া এসে নতুন দিকে ধাবিত হওয়ার চেষ্টা করে। তবে সেই চেষ্টা কালক্রমে ব্যর্থ হয়। কিন্তু জন্ম দিল একটা স্থবিরতার। স্থবির হয়ে পড়ল সংস্কৃতির অঙ্গন।

কিছু লোক নিজেদের ইচ্ছেমতো শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই নতুনের প্রচারাভিযান চালায়। নিজস্ব একধরনের ভাবধারাকে নিয়ে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে নাট্যোৎসব, প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ এসব চলতে লাগল। কিন্তু বিষয়টা বেশি দূর এগোল না। নাটকগুলো দ্বিতীয়বার অভিনীত হলো না বরং স্বাভাবিক ধারাকে বাধা দিয়ে একটা পরিকল্পিত ধারাকে সামনে আসার প্রচেষ্টা বারবার হোঁচট খেয়ে একটা পর্যায়ে থেমেই গেল। এর মধ্যে প্রচুর রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করা হলো। নির্বাচিত সরকারের আগমনে একটু স্বস্তি পাওয়া গেল।


এবার পয়লা বৈশাখে মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার প্রমাণ করেছে যে বাঙালি সংস্কৃতি অসংকোচ প্রকাশের এক দুরন্ত সাহস। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ছোট-বড় সব শহর এমনকি মফস্বল পর্যন্ত এই উৎসবে আপামর মানুষ জোয়ারে আন্দোলিত হয়েছিল। এই অব্যাহত জোয়ার আগামী দিনগুলোতেও আমাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েই গেছে। সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে যে বিভাজনের চেষ্টা ছিল, তা ব্যর্থ হলেও পরস্পরের কাছে অচেনা হয়ে গেছে। এবারে শুধু বাঙালি নয়, বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষজন তাদের বর্ষবরণেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে, যা কয়েক বছরের চেয়ে অনেকাংশে বেশি ছিল।


এ কথা ঠিক, আমাদের দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষজন নানাভাবে বঞ্চিত এবং নিপীড়িত। তাদের এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র হচ্ছে তাদের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি চেতনার মধ্য দিয়েই তারা হাজার বছর ধরে টিকে আছে। তাদের জীবনযাপনের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে তারা যে শুধু ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তা নয়, তারা তাদের জীবন বিপন্ন করে হলেও তা রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকে। তাই সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই আকাঙ্ক্ষিত নয়।
চীন ও রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে শিল্প-সাহিত্যের ওপর সংকোচন নীতি চালু করা হলে, মহৎ কবি-সাহিত্যিকদের অবদান হ্রাস পেতে শুরু করে। তার ঢেউ এসে লাগে আমাদের বাংলা সাহিত্যের ওপরও। সৃজনশীল সাহিত্যিকেরা সবচেয়ে আধুনিক রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে আর খাপ খাওয়াতে পারেন না। এই কারণে বড় বড় শিল্প-নাট্যনির্দেশক এবং সাহিত্যিকেরা রাজনৈতিক দল ত্যাগ করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁদের কালজয়ী প্রতিভার প্রতিফলন পরবর্তীকালে তাঁরা রেখে যান। এই নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু সেখানে কেউ নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলেনি।


ইউনূস সরকারের আমলে এমনভাবে পত্রপত্রিকা, মিডিয়া সর্বত্র সেন্সর করা হয়েছে যে সাংবাদিকেরা জেলখানায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন এবং এই প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এটা কী করে সম্ভব হলো? রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর হঠাৎ করেই মানুষের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করা হলো—এই নিয়ন্ত্রণের ভাবনাটাই আসলে একটা পশ্চাৎপদ প্রক্রিয়া। আজকের দিনে ডিজিটাল পৃথিবী এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। কতভাবে কত ধরনের তথ্য যে মানুষের কাছে এসে পৌঁছায়, সেখানে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চিন্তা এ সময়ে একেবারেই অবান্তর।


আবার শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কখনো না সব সময়ই বুমেরাং হয়ে থাকে। যেকোনো সরকার ক্ষমতায় এসেই তার দলীয় চিন্তার ধারা শিক্ষার কারিকুলামকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তার ফলে শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ সময় বিভ্রান্ত হয়। এই বিভ্রান্তির পথ ধরে নানা ধরনের বিকৃত চিন্তাভাবনা শিশুদের মনোবৈকল্য সৃষ্টি করে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করেই শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা যায় রাজনৈতিক আপসের প্রবাহ। কবি কুসুমকুমারী দাশের পথ ধরে কবিতার সেই লাইন—‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’ কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মানসভূমি তৈরিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।


আমরা যাঁরা ৬০ বা ৭০ বছর আগে কবিতাটি পড়েছি, তাঁদের এখনো সেটা মনে আছে। এই কবিতার ভূমিকা শিক্ষার্থীদের জীবনে সর্বব্যাপী হয়ে থাকে। পাঠ্যক্রমে সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোলের কোন অংশটি কতটুকু থাকবে, তা নির্ধারণ করবেন কারিকুলাম বাস্তবায়ন নিযুক্ত কমিটিতে থাকা ব্যক্তিরা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এসবই আমলাতান্ত্রিক একটি ব্যবস্থার মধ্যে নিমজ্জিত। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা সাধারণত এখানে যুক্ত থাকেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন সচিবেরা। এ বিষয়টি এত দুর্ভাগ্যজনক যে রাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনায় দেশের প্রাজ্ঞজন বা বিশেষজ্ঞরা সঠিকভাবে অংশ নিতে পারেন না। সেখানে নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করেন আমলারা। দেশের পরিকল্পনা কমিশনের যেখানে সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের দ্বারা, সেখানে বহুদিন ধরেই আমলারা রাজত্ব করছেন। দেশের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রেও আমলারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। সেখানে প্রাজ্ঞজন, বিশেষজ্ঞ এমনকি রাজনীতিবিদদেরও কোনো ভূমিকা থাকে না। সরকারের দায়িত্ব রাষ্ট্র পরিচালনা, সেই পরিচালনায় দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গবেষণায় অভিজ্ঞ, রাজনীতিতে বিরুদ্ধপক্ষ হলেও তাঁদেরকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকে না। এটাও আমাদের একধরনের সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা।


আমরা কি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজনে এক হতে পারি না? এক হতে পারলে আমরা অনেক বড় বড় বাধাকে অতিক্রম করতে পারতাম। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা এখন শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। নির্বাচনই মনে হয় একমাত্র গণতন্ত্র! নির্বাচনে যিনি জয়লাভ করলেন, তিনি সর্বেসর্বা। আমাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অর্থের যে খেলা হয়ে থাকে এবং পেশিশক্তির যে প্রভাব থাকে, সর্বোপরি জোয়ার সৃষ্টি করার যে হুজুগ থাকে—সবটা মিলিয়ে নির্বাচনপ্রক্রিয়াও কতটা সুষ্ঠু হয়, তা বিবেচনাযোগ্য। গত পার্লামেন্টে ৮৮ শতাংশ সংসদ সদস্য ছিলেন ব্যবসায়ী। কাজেই সংসদে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো আইন পাস করা সহজ কাজ ছিল না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও