বাংলাদেশে হামের মহামারি এবং একটি জনস্বাস্থ্য চুক্তির অপমৃত্যু
সভ্যতার অগ্রযাত্রায় কিছু বিজয়কে আমরা চিরস্থায়ী বলে ধরে নিয়েছিলাম, যেখানে বিজ্ঞানের জয়গান আর জনস্বাস্থ্যের সাফল্য ছিল আমাদের জাতীয় অহংকার। কিন্তু ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া নিয়মিত বুলেটিন আমাদের সেই দীর্ঘদিনের আত্মতুষ্টির দেয়ালে এক প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। এই বুলেটিনটি কেবল কিছু শুষ্ক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির জীবন্ত দলিল। সেখানে জানানো হয়েছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮টি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে হামের মারণভাইরাস, যার মধ্যে ২ জন সরাসরি ল্যাব-নিশ্চিত হামে এবং বাকি ৬ জন হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। এই মৃত্যুগুলো কোনো দৈব দুর্ঘটনা বা সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক পরাজয় এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক চূড়ান্ত ঘোষণা।
ওই সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র ফুটে ওঠে যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। গত ১৫ মার্চের পর থেকে দেশে হাম পরিস্থিতির যে মারাত্মক ও নাটকীয় অবনতি হয়েছে, তা এর আগে গত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। সরকারি খতিয়ান বলছে যে, গত এক মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৬৫ জন শিশু। কিন্তু প্রকৃত মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক, কারণ একই সময়ে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩৫২ জনে। সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো মৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান মিছিল যা প্রতিদিন দীর্ঘতর হচ্ছে।
গত এক মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩৪ জন শিশু। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যে সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭২ জনে, তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে এক চরম প্রহসন। যখন হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য এবং টিকাযোগ্য রোগ, তখন এক মাসে দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়—এটি একটি সামষ্টিক অপরাধনামা। দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, যেখানে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ১২৯ জন। যদিও ১০ হাজার ৪৯৬ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন, কিন্তু এখনো একটি বিশালসংখ্যক শিশু হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের নির্জনতায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।
ইতিহাসের দর্পণে তাকালে দেখা যায়, হাম মানবজাতির প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে বিধ্বংসী রোগগুলির একটি হিসেবে পৃথিবীকে শাসন করেছে। এর ইতিহাস অন্তত সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত প্রসারিত যখন পারস্যের মহান চিকিৎসক রাজেস (Rhazes)—যাঁর প্রকৃত নাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি (Abu Bakr Muhammad ibn Zakariyya al-Razi)—প্রথমবার হামকে গুটিবসন্ত থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি তাঁর যুগান্তকারী চিকিৎসাগ্রন্থে এই রোগের সংক্রামক ক্ষমতাকে দাবানলের সাথে তুলনা করেছিলেন। তাঁর এক সহস্রাব্দ পর, ১৯৫৪ সালে মার্কিন ভাইরোলজিস্ট জন ফ্র্যাংকলিন এন্ডার্স (John Franklin Enders) এবং থমাস চামার্স পিবলস (Thomas Chalmers Peebles) প্রথমবার ১১ বছর বয়সি ডেভিড এডমন্সটন (David Edmonston) নামক এক বালকের শরীর থেকে হামের ভাইরাস আলাদা করেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে মরিস হিলম্যান (Maurice Hilleman) এই ভাইরাসের ওপর ভিত্তি করে যে টিকা আবিষ্কার করেন, তা কোটি কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে। ১৯৭১ সালে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এমএমআর (MMR) টিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। বাংলাদেশে ব্যবহৃত মিজেলস-রুবেলা (MR) টিকা এই বৈজ্ঞানিক আভিজাত্যেরই এক প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। একটি টিকা যেখানে ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা দিতে সক্ষম, সেখানে ২০২৬ সালের মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত ১৭২ জন শিশুর মৃত্যুর খবর আসা মানে হলো বিজ্ঞানের নয়, বরং রাষ্ট্রের সেই বিজ্ঞান প্রয়োগের চরম নীতিগত পরাজয়।
মহামারি বিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষায় হামের সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বিধ্বংসী। এর মূল প্রজনন সংখ্যা বা বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর (R₀) হলো ১২ থেকে ১৮, যার অর্থ হলো একজন আক্রান্ত শিশু গড়ে ১৮ জন সুস্থ শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। এর তুলনায় কোভিড-১৯ এর প্রজনন সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। হামের মিজেলস মর্বিলিভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর ছেড়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর পর্যন্ত ভাইরাসটি সেখানে তার সংহারী রূপ নিয়ে সক্রিয় থাকে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রাদুর্ভাব
- হাম রোগ