হামের প্রাদুর্ভাব : অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি
নিলয় আর নীলিমার বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দ বছর আগে। সংসার পেতেছিল, স্বপ্ন বুনেছিল, কিন্তু ঘর আলো হচ্ছিল না। সন্তানের জন্য সেই দীর্ঘ অপেক্ষার বছরগুলোয় তারা দেশে বিদেশে ছুটেছে, ডাক্তারের পর ডাক্তার বদলেছে, ধার করেছে, সঞ্চয় ভেঙেছে।
চৌদ্দটি বছর ধরে শুধু একটি মুখের অপেক্ষায় তাদের ব্যয় হয়েছে প্রায় তেত্রিশ লাখ টাকা। তারপর এলো অথৈ। দেড় বছরের সেই শিশু যেন সব শূন্যতা একসঙ্গে ভরে দিয়েছিল। কিন্তু এই বছরের হামের প্রকোপ সেই আলো নিভিয়ে দিলো। অথৈ চলে গেল।
পেছনে রইল একটি খালি ঘর, একটি অপরিশোধিত ঋণের বোঝা এবং একটি হিসাব, যা কোনো পরিসংখ্যানের খাতায় কখনো ওঠে না।
এই পরিবারের ঘটনা বলার কারণ শুধু আবেগ নয়। এই ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের হামের চলতি প্রকোপের সবচেয়ে অনালোচিত দিকটি, অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির এক বিশাল অধ্যায়, যা মৃত্যুর তালিকায় ধরা পড়ে না, কিন্তু হাজার হাজার পরিবারের ভেতরে ধীরে ধীরে জমতে থাকে।
বাংলাদেশে ১৫ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ছাব্বিশ দিনে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত হয়েছে তেরো হাজার চারশো সাতানব্বই জন শিশু, নিশ্চিত সংক্রমণ দুই হাজার চারশো নয়টি এবং মৃত্যু একশো সাতচল্লিশ জনের বেশি। ছাপ্পান্নটিরও বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই প্রকোপ বিশ বছরে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম এই সংখ্যাগুলো বলছে। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটছে, সে কথা কেউ বলছে না।
হামের চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে, এটা সত্য। কিন্তু চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় কখনো শুধু ওষুধের দামে শেষ হয় না। বিএমসি হেলথ সার্ভিসেস রিসার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণা বলছে, সরকারি হাসপাতালে হামের চিকিৎসায় পরিবারের গড় পকেট খরচ ৪৮ ডলার এবং বেসরকারি হাসপাতালে সেটা ৮৩ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। যাতায়াত, থাকা, খাওয়া, পথ্য এবং কর্মঘণ্টার মূল্য যোগ করলে পরিবারের মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৩১ থেকে ১৮২ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় পনেরো থেকে বাইশ হাজার টাকা।
অথচ সরকার একজন ভর্তি রোগীর পেছনে গড়ে ব্যয় করে মাত্র ২২ ডলার। বাকি পুরো ভারটা গিয়ে পড়ে পরিবারের কাঁধে। এই গবেষণার পরিসংখ্যানগুলো পড়লে বোঝা যায় ক্ষতির গভীরতা আসলে কতটা।
হামের চিকিৎসার ব্যয় বাংলাদেশে বার্ষিক মাথাপিছু জিডিপির আট শতাংশের সমান। শতকরা নব্বই ভাগেরও বেশি পরিবার জানিয়েছে, হামের চিকিৎসায় তাদের মাসিক আয়ের দশ শতাংশেরও বেশি চলে গেছে এবং গড়ে সেটা ছিল মাসিক আয়ের বত্রিশ শতাংশ।
শুধু তাই নয়, চুয়াল্লিশ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে হামের ব্যয় মোট মাসিক খরচের পঁচিশ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে গরিব পরিবারগুলোর আটাত্তর শতাংশ বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয়ের মুখে পড়েছে, যেখানে ধনী পরিবারগুলোয় এই হার মাত্র একুশ শতাংশ। অর্থাৎ একই রোগ সচ্ছলদের কাছে অস্বস্তি, আর দরিদ্রদের কাছে পথে বসার কারণ।
এবার এই পরিসংখ্যানকে চলতি প্রকোপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। ২০১৮ সালে মাত্র দুই হাজার দুইশো তেষট্টিটি নিশ্চিত হামের কেসে পরিবারগুলোর সম্মিলিত পকেট খরচ ছিল প্রায় এক লাখ বাইশ হাজার ডলার এবং সমাজের মোট আর্থিক ক্ষতি তিন লাখ আটচল্লিশ হাজার ডলার।
২০২৬ সালে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা সেই ২০১৮ সালের প্রায় সাত গুণ এবং সন্দেহভাজন রোগী ধরলে সংখ্যাটি আরও বহুগুণ বেশি। সেই আনুপাতিক হিসাবে শুধু প্রত্যক্ষ পারিবারিক ব্যয় ধরলেই চলতি মৌসুমে ক্ষতির পরিমাণ সহজেই পঞ্চাশ থেকে আশি কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরোক্ষ ক্ষতি যোগ হলে সংখ্যাটি আরও বড় হয়। সেই পরোক্ষ ক্ষতির হিসাবটি কেউ করে না, কিন্তু সেটাই সবচেয়ে ভারী বোঝা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- আর্থিক ক্ষতি
- টিকাদান কর্মসূচি
- হাম রোগ