পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না
আমাদের যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হলো, এই গণ-অভ্যুত্থানে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে এবং গণ-আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সংস্কার তথা রাষ্ট্র মেরামত। এর পাশাপাশি অবশ্যই নির্বাচন ও বিচার-এই দুটোও ছিল। সংস্কার, রাষ্ট্র মেরামত এবং কতগুলো মৌলিক সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে ছয়টি কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন অন্যতম। এরপর আরও পাঁচটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে।
প্রথম ছয়টি সংস্কার কমিশন যখন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিপোর্ট পেশ করে, তখন সরকার ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে প্রথম ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধানদের নিয়ে এ ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। ঐকমত্য কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর, যেগুলোর মাধ্যমে আমাদের ওপর চেপে বসা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ প্রশস্ত হয়।
আমরা ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধানরা প্রথমে কমিশনগুলোর দেওয়া সহস্রাধিক প্রস্তাব থেকে ১৬৬টি গ্রহণ করি। এ প্রস্তাবগুলো নিয়ে একটি স্প্রেডশিট তৈরি করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রেরণ করি। তাদের কাছে জানতে চাই কোনগুলো সম্পর্কে তারা একমত, কোনগুলো সম্পর্কে দ্বিমত বা আংশিকভাবে একমত এবং একই সঙ্গে কীভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এটা ছিল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপে আমরা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এককভাবে বসেছি। বিএনপির সঙ্গে তিন দিন, জামায়াতের সঙ্গে দুই দিন, তরুণদের এনসিপির সঙ্গে দুই দিন-এভাবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্তত একদিন আলাপ করেছি। আলাপ করে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি এবং এ আলোচনার মাধ্যমে আরও অনেক বিষয়ে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়।
তৃতীয় ধাপে আমরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একত্রে বসেছি, যা বিটিভিতে প্রচার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ আট মাসের মতো আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এবং পর্দার অন্তরালে আলাপ-আলোচনা করে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাই। ঐকমত্য হওয়া ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ৩৬টি নোটিফিকেশন, অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বাকি ৪৮টির জন্য সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এই ৪৮টি বিষয় নিয়েই জুলাই গণভোট হয়। এই ৮৪টি বিষয়ের ঐকমত্যই হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এ সনদ বাস্তবায়নের জন্য একমত হওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দল এতে স্বাক্ষর করেছে এবং বলেছে, তারা পরিপূর্ণভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। পাশাপাশি তারা এই জুলাই জাতীয় সনদকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাবে না।
এরপর সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ওই ৪৮টি বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন। এ আদেশের ভিত্তিতে ৪৮টি বিষয়ে গণভোট হয় এবং সেখানে প্রশ্ন ছিল, তারা এ বিষয়গুলোতে একমত কি না। আমরা দেখেছি, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এই সংস্কারগুলোর পক্ষে জনরায় দিয়েছে। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতির ওই আদেশে একটি বিধান ছিল যে, যারা নির্বাচিত হবে, ভোটের পর তারা দুটি ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের জন্য সংসদ-সদস্য হবে, আবার ১৮০ কর্মদিবসের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও ভূমিকা পালন করবে, যার মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার করা সম্ভব হবে।
তবে নির্বাচনের পর সবাই সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি, যা জনগণ যে বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচনের পর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা শুরু হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করতে পারেন না এবং এটি বৈধ নয়। পাশাপাশি তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে তাদের যে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা দ্বিমত ছিল, সেগুলো গণভোটে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।