আর কত শিশু মরলে হামকে ‘মহামারি’ বলা যাবে?

বিডি নিউজ ২৪ রাজু নূরুল প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:৫৫

১২ মাস বয়সী ছোট্ট শিশু আব্দুল্লাহর মরদেহ রাখা হয়েছে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের স্ট্রেচারে। পাশেই মা ইতি মনির কান্নায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে! মাত্র এক বছর বয়সী পুত্রকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা রাসেল। হাসপাতালে সৃষ্টি হয়েছে এক করুণ পরিবেশ। হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৩ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আব্দুল্লাহকে। যত দিন গড়িয়েছে, তার অবস্থার অবনতি হয়েছে। এক বছর বয়সী শিশু জ্বরের উচ্চ তাপমাত্রা আর তীব্র ব্যথার সঙ্গে কতক্ষণ লড়াই করতে পারে? শেষমেশ অসীমের কাছে তার যাত্রার মধ্য দিয়ে জীবনরেখা থেমে গেছে।


২.


ছোট্ট ইনায়ার প্রচণ্ড জ্বর, সারা শরীরে র‍্যাশ; কচি হাতে পরানো ক্যানুলা দিয়ে চলছে স্যালাইন, নাকে লাগানো হয়েছে নল। নয় মাসের এ শিশুর অনবরত কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে আসছে। ইনায়ার সঙ্গে হাসপাতালে আছে তার মা ও দাদি। চোখের সামনে কাঁদতে থাকা ইনায়ার ব্যথা আর কতক্ষণ সহ্য করা যায়? মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন তারা। কখনো ছুটছেন নার্সের কাছে, কখনো চিকিৎসকের কাছে, আবার কখনো ছুটছেন ওষুধের দোকানে। ইনায়ার মা ও দাদির মতো বাকি অভিভাবকদেরও একই রকম দিশেহারা অবস্থা।


শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড ঘুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদকও আক্রান্ত হয়েছেন ইনায়ার কষ্টে। তিনি বলছেন, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডের ৬০টি শয্যার সবকটি রোগীতে পূর্ণ। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে ভর্তি ছিল ৭৮ জন শিশু। কিছু শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। সবারই হাতে ক্যানুলা, নাকে নল। শিশুদের চিৎকার-কান্না থামাতে পারছেন না মা-বাবা ও স্বজনরা। অভিভাবকদের কেউ শিশুকে সামলাচ্ছেন, কেউ নার্স-চিকিৎসকদের পেছনে ছুটছেন, কেউবা ওষুধ কিনতে হাসপাতালের বাইরে ছোটাছুটি করছেন।


৩.


আজ ১০ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার ঘটনা। শিশু রোগীতে ঠাসা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড। অসুস্থ সন্তানদের দেখভাল করতে অভিভাবকেরা ব্যস্ত। কোনো মা তার আদরের সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার চেষ্টা করছেন শিশুকে খাওয়ানোর। এর মধ্যে হঠাৎ এক মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ। অন্যরা তখন বলতে শুরু করেন, এই যে আরেক মায়ের বুক খালি হলো। আব্দুল্লাহ নামের শিশুটি মারা গেছে—চিকিৎসক এমনটি জানানোর পর আহাজারি করা মা আরিফা আক্তার বলতে থাকেন, ‘আমার বুকের ধনরে ফিরায়া দে আল্লাহ। আমার ছেলে কী আর হাসত না? জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হইছিলাম, মেডামরা কইছে ওষুধ খাইলেই ভালো হইয়া যাইব। আল্লাহগো তুমি কী করলা।’


সন্তান হারানো আরিফা আক্তারের কান্না ছুঁয়ে যায় আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা অন্য শিশুর স্বজনদের। আতঙ্কিত হয়ে কোনো কোনো মা-বাবা তাদের শিশুকে কোলে তুলে পায়চারি করতে থাকেন। কেউ আবার এগিয়ে আসেন আরিফাকে সান্ত্বনা দিতে।


৪.


আমি মাত্র তিনটি শিশুর মৃত্যুর দৃশ্য বললাম, সংবাদমাধ্যমে যাদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু খবর পাচ্ছি দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে এমন হৃদয়বিদারক গল্প। ছোট্ট ইনায়া কিংবা আব্দুল্লাহরা বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে, দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়া হাম কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের প্রাণ। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় আহাজারি করছে হাজার হাজার শিশু। হাসপাতালে বিছানা নেই, ওষুধ সরবরাহ অপ্রতুল, প্রয়োজনীয় ডাক্তার নেই—কিন্তু তাতে কোথাও কিছু থেমে নেই। শুধু যার গেছে, সেই জানে।


৫.


শিশুরা যখন এই দুঃসহ সময় পার করছে, উৎকণ্ঠায় উদগ্রীব যখন তাদের পিতা-মাতা ও অন্য অভিভাবকেরা, তখন জাতীয় সংসদে অধিবেশন চলছে। এবারের সংসদে বেশ বড়সড় একটি বিরোধী দল আছে, কিন্তু সরকার কিংবা বিরোধী দল—কারও মুখে বেঘারে প্রাণ হারানো কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা শিশুদের নিয়ে টু-শব্দটি নেই। সরকারি দল প্রতিদিন ডজনখানেক বিল পাসে ব্যস্ত, বিরোধী দল ব্যস্ত সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে জুলাই সনদকে তার স্থলে বসানো যায় কিনা—তার ধান্ধায়। ইনায়া ও আব্দুল্লাহদেরকে নিয়ে কথা বলার সময় কোথায় তাদের?


৬.


এর মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তো পই পই করে বারণ করে দিয়েছেন যে, হাম নিয়ে আমরা যেন বেশি কথা না বলি। এতে নাকি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে! রোগীরা ভয় পেয়ে যাবে! তিনি আমাদেরকে ’প্যানিক’ তৈরি না করার পরামর্শও দিয়েছেন। অথচ আমরা জানতাম, বিপদ এলে সেটি নিয়ে কথা বলতে হয়, আলোচনা করে ঠিক করতে হয় যে বিপদ কীভাবে সামলানো যাবে। সবাই মিলে সেই বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় না খুঁজে এড়িয়ে যাওয়াই যে কার্যকর সমাধান—স্বাস্থ্যমন্ত্রী না বললে আমরা জানতেই পারতাম না।


ভাগ্যিস, এর মধ্যে একজন ব্যতিক্রম আছেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের একাংশ) থেকে নির্বাচিত বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী রুমিন ফারহানা। তিনি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ৭১ বিধির ওপর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে দেশের হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনে ৯৮ জন শিশুর সন্দেহজনকভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বুদ্ধির তারিফ করতেও ছাড়েন নি তিনি, “আমি তো জানতাম আমি ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছি, ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে তো কথা বলছি না। সংসদেও তাহলে জনস্বার্থ নিয়ে কথা বলতে পারব না?”

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও