রাজনীতির মাঠটা আবার সরগরম হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না—এই কথাটি তো মিথ্যে নয়। ইউনূস সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল, সংসদে বিল পাস করে সেটাকে পোক্ত করল ক্ষমতাসীন বিএনপি। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা হয়েছে আগে। এমনকি বিএনপি দলটিও বহুবার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার কারণে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছে। নিজেদের দলকে বহুদলীয় রাজনীতি ফিরিয়ে দেওয়া দল বলে নিজেদেরই তারিফ করেছে। এখন বিএনপি নিজেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করাকে পোক্ত করল। এর ফল কী হবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
লেখাটিকে গুরুগম্ভীর করতে চাই না। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব মুজফ্ফর আহমদের একটি চিঠির প্রসঙ্গে কিছু কথা বলে আমরা সংক্ষেপে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে কিছু কথা বলব।
কেন এই লেখায় হঠাৎ মুজফ্ফর আহমদ উঠে এলেন, তা বোঝার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। লেখাটি নেওয়া হয়েছে মুজফ্ফর আহমদেরই একটি লেখা থেকে এবং অনেকটাই অবিকল তাঁরই ভাষায়। ‘দুটি চিঠির ইতিহাস’ নামের লেখাটি নেওয়া হয়েছে ‘গণ আন্দোলনে ছাপাখানা’ বইটি থেকে। পড়া যাক।
গত শতাব্দীর বিশের দশক থেকেই সারা বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন বিষয়ে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ছিল। ভারতবর্ষও তা থেকে বাদ যায়নি। ১৯২৭ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর তারিখে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিকে একটি চিঠি লেখা হয়েছিল, যা ইউরোপ থেকে সরাসরি একজন নাবিকের হাত মারফত কলকাতায় আসে। চিঠিটা ছিল খুবই বড়। যাঁরা এই চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাঁরা চাইছিলেন না যে তা ডাকে পাঠানো হয়। এ কথা পরিষ্কার, মুজফ্ফর আহমদের নামে যদি ডাকযোগে কোনো চিঠি আসে, তাহলে তা আদৌ প্রাপকের হাতে পৌঁছুবে না, সরাসরি তা পড়বে পুলিসের হাতে। তাই, লোক মারফতে পাঠাবার উদ্দেশ্যে চিঠিখানা লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লন্ডনে কলকাতার একজন নাবিক রাজি হন যে তিনি কলকাতায় পৌঁছে চিঠিখানা মুজফ্ফর আহমদের হাতে পৌঁছে দেবেন। নাবিকের নাম আবদুল হাকিম, বাড়ি খিদিরপুরের ইকবালপুর এলাকায় শাহআমান লেনে। যে চিঠিখানা এই আবদুল হাকিম নিয়ে এসেছিলেন, সেই চিঠির খামের ওপর টাইপ করা ছিল: To be delivered personally to Muzaffar Ahamad 2/1, Europian Asylum Lane, Calcuita. (কলকাতার ২/১, ইউরোপীয়ান এসাইলাম লেনে ব্যক্তিগতভাবে মুজফ্ফর আহমদের হাতে পৌঁছিয়ে দিতে হবে)।
আবদুল হাকিম লেখাপড়া জানা নাবিক ছিলেন। তাঁর মাতৃভাষা উর্দু। কিছু ইংরাজিও জানতেন। মুজফ্ফর আহমদের নামে আসা চিঠিখানা তিনি তাঁর রাইটিং প্যাডের ভিতরে রেখে দিয়েছিলেন। চিঠিটা কলকাতায় নিয়েও এসেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি কলকাতায় এসে একেবারেই ভুলে যান যে লন্ডন হতে তিনি একটি দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভার নিয়ে এসেছেন। তাঁর জাহাজ দেশের দিকে রওয়ানা হওয়ার পরে এবং তাঁর কলকাতায় ফেরার পরে সম্ভবত তাঁর কোনো চিঠি লেখার প্রয়োজন পড়েনি, তাই মুজফ্ফর আহমদের নামে লেখা চিঠিটা তাঁর চোখেও পড়েনি। সে অবস্থায়ই রাইটিং প্যাডসহ তিনি আবার লন্ডন পাড়ি জমান। বিপদের সকল ঝক্কি মাথায় নিয়ে আবদুল হাকিম পত্রখানা লন্ডন হতে নিয়ে এলেন, অথচ কলকাতায় পৌঁছে তা দিতে ভুলে গেলেন। তাঁর জাহাজ এডেন বন্দরের কাছাকাছি যখন পৌঁছাল তখন তাঁর বাড়িতে চিঠি লেখার ইচ্ছে হলো। রাইটিং প্যাডটি খোলা মাত্রই তিনি দেখতে পেলেন মুজফ্ফর আহমদের জন্য নেওয়া চিঠিটা! তিনি খুবই অনুতপ্ত হলেন। তিনি যদি চিঠিটির গুরুত্ব বুঝতেন, তাহলে তখনই তা নষ্ট করে ফেলতেন। কিন্তু সেটা না করে এডেন বন্দরে তিনি নিজের চিঠিটাসহ মুজফ্ফর আহমদের চিঠিটা ডাকে দেওয়ার জন্য জাহাজের পার্সারের (Purser) হাতে দিলেন। পার্সার মুজফ্ফর আহমদের চিঠির ঠিকানা থেকে To be delevered personally (ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছে দিতে হবে) কথাটা কেটে দিয়ে দুখানা চিঠিই এডেন বন্দরে ডাকে ফেলে দিলেন।
না বোঝার কোনো কারণ নেই, এই চিঠি মুজফ্ফর আহমদের হাতে আর পৌঁছায়নি। পৌঁছেছিল সোজাসুজি পুলিসের হাতে। মুজফ্ফর আহমদসহ পার্টির নেতারা জানতেই পারলেন না যে একজন নাবিকের মারফতে একখানা বৃহদাকারের চিঠি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নামে পাঠানো হয়েছিল এবং তা শেষ পর্যন্ত পুলিসের হাতে পড়েছে।
চিঠিটার কী গতি হলো ভেবে লন্ডনের কমরেডরা উৎকণ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁরা মুজফ্ফর আহমদকে লিখলেন, ‘এদেশে আসে হয়তো এমন একজন নাবিককে তুমি চেন।’ কিন্তু তিনি কিছুই বুঝতে পারেননি। এই চিঠিকে উপলক্ষ করে ভারতের ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কেন্দ্রীয় আইন সভায় (লেজিস্লটিভ এসেমব্লিতে) একটি আইনের খসড়া পেশ করল। এর নাম ছিল Public Safety Bill (জননিরাপত্তা আইন)। কেন্দ্রীয় আইন সভায় পন্ডিত মতিলাল নেহরু ছিলেন কংগ্রেস দলের নেতা। তিনি তাঁর দলের সদস্যদের জানালেন যে অনেক দিন আইনসভায় কোনও বিষয়ে জোর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়নি। এবারে তা করতে হবে। অন্য অনেক সদস্যও বিলটির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। এই বিলের মোদ্দাকথাটা ছিল যে, দরকার হলে ভারতবর্ষ থেকে ইউরোপীয় ব্রিটিশ প্রজাদেরও বের ক’রে দেওয়া চলবে। বিদেশিদের ভারতে থাকা নিয়ন্ত্রিত করার জন্য যে-আইন ছিল তা কোনও ব্রিটিশ প্রজার ওপরে প্রয়োগ করা হতো না। বিলের বিশেষ লক্ষ্য ছিল বেন ব্রাডলে ও ফিলিপ স্প্রাট্ নামে দুজন গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য। তাঁরা এদেশের কমরেডদের সঙ্গে মজুরদের সংঘবদ্ধ করার কাজ করতেন। পাবলিক সেফটি বিলকে আইনে পরিণত করার জন্য সরকার পক্ষ হতে যুক্তি দেখানো হলো যে ভারতে কমিউনিজমের (সাম্যবাদের) প্রসার বাড়ছে। তা বন্ধ করার জন্য এই রকম একটা আইনের দরকার। বিরোধী সভ্যরা জবাবে বললেন সরকার পক্ষ বড় বাড়িয়ে কথা বলছেন। তারপরেই ভারত সরকারের হোম মেম্বার পূর্বোল্লিখিত চিঠিখানা বার করে তার অংশবিশেষ পড়ে শোনাতে লাগলেন। এইভাবে কেন্দ্রীয় আইন সভায় বিলটি নিয়ে জোর বিতর্ক চলতে লাগল। সারা দেশ ঔৎসুক্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় আইন সভার বিবরণ খবরের কাগজে পড়তে লাগলেন। বিরুদ্ধ পক্ষের কোনো কোনো সভ্য বললেন কমিউনিজমটাই বা এমন কি খাবার জিনিস? হিন্দু মহাসভার নেতা ডাক্তার মুঞ্জে বললেন যে তিনিও একজন কমিউনিষ্ট। কয়েকজন সভ্য অধ্যাপক হ্যারল্ড লাসকির ‘কমিউনিজম’ নামক বইখানা কিনে পড়ে ফেললেন। আইন সভার হৈমন্তিক অধিবেশনে বিলের ওপরে বিতর্ক শেষ হলো না। ইতোমধ্যে আলোচিত পত্রখানা ‘এসেমব্লি লেটার’ (আইন সভার পত্র) নামে খ্যাত হয়ে পড়ল। পরে যখন মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় আসামীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে এই চিঠিখানা [একজিবিট্ পি- ৩৭৭ (১) ] আদালতে দাখিল করা হলো তখনও তাকে বলা হলো ‘এসেমব্লি লেটার!’ কেন্দ্রীয় আইন সভার বাজেট অধিবেশনে আবার পাবলিক সেফটি বিলের আলোচনা সরকার পক্ষ থেকে তোলা হলো। আইন সভার সভাপতি ছিলেন বিঠল ভাই প্যাটেল। তিনি বললেন, মীরাটের আদালতে যে ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা শুরু হয়েছে পাবলিক সেফটি বিলের প্রতিপাদ্য বিষয় সে মোকদ্দমার বিষয়ভুক্ত হয়ে পড়েছে। কাজেই, বিলটির আলোচনা আর কেন্দ্রীয় আইন সভায় চলতে পারে না। দেশময় আলোড়ন সৃষ্টিকারী পাবলিক সেফটি বিলের পরিসমাপ্তি এই ভাবেই ঘটল।