শিশুর দেহে নির্যাতন, সমাজের নীরবতা: এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
শিশুটির বয়স মাত্র চব্বিশ দিন। মায়ের কোল ছেড়ে এখন সে হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছে। শিশুটির ডান হাতের আঙুলগুলো কাটা। ডান পায়ে পুরনো পোড়া ক্ষত রয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। হয়তো তার ছোট পা-টিও কেটে ফেলতে হতে পারে।
বাচ্চাটির এই অবস্থার জন্য দায়ী আর কেউ নয়—তারই জন্মদাতা মা-বাবা। ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর জন্য শিশুটির হাতের আঙুল কেটে ফেলা এবং শরীরে আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মা-বাবার বিরুদ্ধে।
মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে দিনাজপুরের হিলিতে। কেবলমাত্র সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চার ওপর বাবা-মায়ের এই অত্যাচারের ঘটনা সবকিছুকে হার মানিয়েছে। এলাকার মানুষজন জানিয়েছেন, জন্মের কিছুদিন পর থেকেই মা শিশুটির ওপর নির্যাতন শুরু করে। প্রথমে মা শিশুটির হাতের আঙুল কেটে দেয়। পরে বাবা বিচ্ছিন্ন আঙুলগুলো পাশের পুকুরে ফেলে দিয়ে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করে। শিশুটির কান্না ও চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে পুলিশে খবর দেয়।
মা-বাবা দুজনেই মাদকাসক্ত হওয়ায়, মাদকের টাকা জোগাড় করতে শিশুটিকে প্রতিবন্ধী বানিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর পরিকল্পনা করেছিল তারা। তাদের ধারণা ছিল, পঙ্গু শিশুকে দেখে মানুষ বেশি ভিক্ষা দেবে। নবজাতকটি গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ভয়াবহ অমানবিক খবরগুলোকে কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অবিশ্বাস করবো কেমন করে? আমাদের চারপাশেই এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে আরেকটি খবরে দেখা গেল, ডোবায় পড়ে থাকা শাবকের মৃতদেহের পাশে মা হাতি ও বাবা হাতি তিন দিন ঠায় দাঁড়িয়ে শোকে কাতর হয়ে রইলো। কেউ তাদের সরাতে পারছিল না। তিন দিন পর শোকার্ত মা হাতি ও পুরুষ হাতিটি ডোবার কাছ থেকে সরে গেলে শাবকটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ডোবা থেকে উদ্ধার হওয়া দুই মাস বয়সী হাতি শাবকটির মাথা ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শাবকটির মাথায় ও শরীরের কয়েকটি স্থানে আঘাতের ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে। ক্ষতচিহ্ন দেখে মনে হয়েছে, দূর থেকে ছোড়া শক্ত কোনো বস্তু বা পাথরে শাবকটি মাথায় আঘাত পেয়েছে। ভেটেরিনারি সার্জন বলেছেন, হাতির শাবকটিকে হত্যা করা হয়েছে, আর তা করেছে মানুষ। চিকিৎসকেরা বলেছেন, বাঁচানোর চেষ্টার অংশ হিসেবেই মা হাতি তার শাবকটিকে হয়তো ডোবায় নিয়ে গেছে। আহত বাচ্চার মাথার যন্ত্রণা লাঘব এবং পানি খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ডোবায় নিয়ে যায় মা হাতি।
দুটি ঘটনা দেশের দুই প্রান্তে, আর দুই ক্ষেত্রেই বাবা-মা ও শিশু জড়িত। মানুষ নামের বাবা-মা পাষণ্ড—মাদকের টাকা জোগাড় করার জন্য নিজের সদ্যজাত শিশুর আঙুল কেটে পঙ্গু করেছে, শরীরে দিয়েছে গরম ছ্যাঁকা। এরা কতটা নির্দয় ও দানব, তা স্পষ্টই বোঝা যায়। মাদক তাদের বোধবুদ্ধি, মায়া-মমতা সব লোপ করিয়েছে। স্বাভাবিক কোনো মা-বাবার পক্ষে সন্তানের ক্ষতি করা অসম্ভব।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ভিক্ষাবৃত্তি
- শিশু নির্যাতন