জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প কি স্বচ্ছতা হারাচ্ছে
বাংলাদেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বা শিপ রিসাইক্লিং শিল্প বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই গভীর নজরদারির মধ্যে রয়েছে। একদিকে এই খাত দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের ইস্পাতের বড় একটি অংশ এই শিল্প থেকেই আসে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এর ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রকব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এই শিল্প। বাংলাদেশ যখন বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাজারের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন কেবল প্রযুক্তিগত মানদণ্ড পূরণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি ও স্বাধীনতা।
২০১৮ সালের শিপ রিসাইক্লিং অ্যাক্ট অনুযায়ী, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের লাইসেন্স প্রদান, তদারকি, পর্যবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগের জন্য বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) গঠন করা হয়। একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে শিল্প আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ ছিল।
তবে আইনের একটি কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে ক্রমেই শাসনব্যবস্থাগত উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। তা হলো, নিয়ন্ত্রিত শিল্পের প্রতিনিধিদেরই নিয়ন্ত্রক বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, মোট ১৪ সদস্যের বোর্ডে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের মালিকদের পক্ষ থেকে তিনজন প্রতিনিধি থাকেন। সেখানে শিপ রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে বোর্ড সভার জন্য কোরাম নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র চার সদস্য। এই কাঠামো সাংবিধানিক নীতি, প্রশাসনিক আইন, আন্তর্জাতিক শাসনমান এবং বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের প্রত্যাশার আলোকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কোরাম–সংক্রান্ত বিধানটি একটি সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। যেহেতু বৈধ সভার জন্য মাত্র চারজন সদস্য প্রয়োজন, তাত্ত্বিকভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে তিনজন শিল্প প্রতিনিধি এবং আরও একজন সদস্য মিলে বোর্ডের বৈঠক সম্পন্ন করতে পারেন এবং সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারেন। বাস্তবে এমনটি কখনো ঘটুক বা না ঘটুক, কাঠামোগতভাবে এই সম্ভাবনা থেকেই যায় যে নিয়ন্ত্রিত শিল্পের প্রতিনিধিরা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তে অসম প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
এ পরিস্থিতিকে শাসনব্যবস্থা–বিষয়ক গবেষণায় প্রায়ই রেগুলেটরি ক্যাপচার বলা হয়। এর অর্থ এই নয় যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে অনিয়ম করছে। বরং এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে নিয়ন্ত্রক ও নিয়ন্ত্রিত পক্ষের মধ্যকার সীমানা অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রকের ওপর শিল্পের প্রভাব বেড়ে যায়।
এতে জনসাধারণের আস্থা দুর্বল হতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণের অগ্রাধিকার বৃহত্তর জনস্বার্থ থেকে সরে গিয়ে নির্দিষ্ট স্বার্থগোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকতে পারে। বিশেষ করে পরিবেশ সুরক্ষা ও শ্রমিকের নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা বাস্তব প্রয়োগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবিধানিক কাঠামোয় আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ন্যায়বিচার ও জনজবাবদিহির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের আইনগত ও ন্যায্য আচরণের অধিকার নিশ্চিত করে। যখন কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যেই নিয়ন্ত্রিত শিল্পের প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা পান, তখন সব অংশগ্রহণকারী সমানভাবে তদারকির আওতায় থাকছেন কি না, সে প্রশ্ন ওঠে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ হলো ২১, যেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগকারী ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো প্রজাতন্ত্র ও জনগণের সেবা করা। একটি আইনগত নিয়ন্ত্রক বোর্ডের সদস্যরা নিঃসন্দেহে জনক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ফলে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক স্বার্থসম্পন্ন ব্যক্তিদের এমন প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ব্যক্তিগত প্রণোদনা এবং জনস্বার্থের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক আইন যা মূলত কমন ল ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তা এই উদ্বেগকে আরও জোরদার করে। প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো ‘নেমো জুডেক্স ইন কসা সুয়া’ অর্থাৎ কেউ নিজের মামলায় নিজেই বিচারক হতে পারেন না। এখানে প্রকৃত পক্ষপাত প্রমাণ করার প্রয়োজন হয় না, বরং পক্ষপাতের যৌক্তিক আশঙ্কাই একটি সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে যথেষ্ট।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প