অর্থনীতিতে দ্রুত গতি সঞ্চার করা প্রয়োজন
বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) সরকার গঠনের পর দেড় মাস অতিবাহিত হয়েছে এবং নতুন প্রত্যাশা, লক্ষ্য এবং অঙ্গীকার নিয়ে পথচলা শুরু হয়েছে। এই কাজটি আজ থেকে দেড় বছর আগেই হতে পারত, অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যেতে পারত। বিগত দেড় বছর একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে যে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে, সেটি অন্তত হতো না। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে, কিন্তু অর্থনীতির যে করুণ দশা করে গেছে, তার দায়ভার এখন পড়েছে নতুন সরকারের ওপর।
মানুষ সব সময়ই নিকট অতীত ভুলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা দেশের মানুষ একসময় ভুলে যাবে এবং নতুন সরকারের কাছ থেকে সবকিছু প্রত্যাশা করবে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, যার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘ হয়, তাহলে জ্বালানি তেলের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।
আর এমনটি হলে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়তে পারে এবং সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
বিগত দেড় বছরের অধিক সময়ে দেশের অর্থনীতিতে যে মাত্রার ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা খুব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। যেমন—দেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন বা গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট) ছিল ৬ শতাংশের ওপরে, অথচ মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে সেই জিডিপি ৩ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। এই জিডিপি পুনরায় টেনে ৬ শতাংশে উন্নীত করার কাজটা মোটেই সহজ নয়।
কেননা জিডিপি ওঠে অনেক ধীরগতিতে, অথচ পড়ে যায় খুব দ্রুতগতিতে। এই দেড় বছরে যে কয়েক শ কারখানা, ফ্যাক্টরি এবং উৎপাদকেন্দ্র ধ্বংস এবং বন্ধ হয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালু করার কাজ যে কত কঠিন, তা যখন এই কাজে হাত দেওয়া হবে, তখনই ভালোভাবে বোঝা যাবে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী কয়েক লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং সদ্য বেকার হওয়া এত বিপুলসংখ্যাক মানুষের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটি প্রায় অসম্ভব। ব্যাংকিং খাতে অতিমাত্রায় কড়াকড়ি করার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ একলাফে দুই লাখ কোটি থেকে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সেই ঋণ পুনরায় ভালো ঋণে রূপান্তর করার কাজটি মোটেই সহজ নয়।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, অনেক ভালো ঋণগ্রহীতা ছিলেন, যাঁরা কষ্ট করে হলেও নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে গেছেন, তাঁরাও এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় অতিমাত্রায় কঠোরতা আরোপের কারণে ঋণখেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছেন। তাঁদের মতো ভালো ঋণগ্রহীতাদের সমস্যা দূর করার কাজটিও খুব সহজ হবে না। সাধারণ মানুষের যে বৃহত্তম অংশ বেঁচে থাকার তাগিদে নিজেদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ভেঙে ফেলেছে, তাদের সঞ্চয় ফিরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত মানুষের একটি অংশ তাদের ব্যবসার মূলধন হারিয়ে ফেলেছে এই দুর্দিনে সংসার চালাতে গিয়ে। আবার অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করার কাজটিও সহজ হবে না। দেশের অর্থনীতিতে এ রকম হাজারো সমস্যার পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র দেড় বছরের শাসনামলে, যার সঠিক সমাধান করে অর্থনীতিতে গতিসঞ্চারের কাজ মোটেই সহজ নয়।