‘স্বস্তির ঈদযাত্রা’, নাকি কাঠামোগত হত্যা
এবারের ঈদযাত্রায় দেশের মানুষ মর্মান্তিক কতগুলো দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। সদরঘাটে দুই লঞ্চের চাপে পিষ্ট হয়ে করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মায় যাত্রীবাহী বাসডুবির ঘটনায় ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কুমিল্লায় বাসের ধাক্কায় প্রাইভেট কারে থাকা একই পরিবারের চারজনসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে তেল শেষ হয়ে থেমে যাওয়া বাসের পাঁচ যাত্রী ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে ১৭ থেকে ২৭ মার্চ ভোর পর্যন্ত সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে ২৮০ জনের। অন্যদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ১৪ থেকে ২৮ মার্চ এই ১৫ দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন। এর আগের বছর একই সময়ে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হয়েছিলেন।
- ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ার ঘটনার পর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে গুরুতর কাঠামোগত সমস্যার কথা, যার মধ্যে রয়েছে রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক।
- সড়কপথে ফিটনেস ছাড়াই হাজার হাজার যানবাহন চলছে, চালকের দক্ষতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, ট্রিপভিত্তিক মজুরির মাধ্যমে চালকদের বেপরোয়া হতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
- রেলপথে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে জীর্ণ রেলপথ, ইঞ্জিন, কোচ ও বগির কারণে, রেলের সিগন্যাল ব্যবস্থার সমস্যা, অরক্ষিত রেলক্রসিং ও ট্রেন থামানোর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকার কারণে।
অথচ সড়ক, নৌ ও রেল—এই তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ‘আমরা মনে করছি, যেকোনো সময়ের চেয়ে দেড় কোটি মানুষ নিরাপদে, স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছে।’ ঈদযাত্রায় এবার ৩০০ মৃত্যুর খবর ‘সঠিক নয়’ দাবি করে মন্ত্রী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দেওয়া ১৭০ জন্য নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
অথচ বিআরটিএ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর যে হিসাব দেয়, তা নিয়ে দেশে বহুদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। আগে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আর শাজাহান খানদের আমরা এই ভাষায় কথা বলতে দেখেছি। তাঁরা বিআরটিএর অনির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়া অস্বীকার করতেন। এখন এই কাজ করলেন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। মাননীয় মন্ত্রী এক কাজ করতে পারেন, এসব দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের কাছে গিয়ে জানতে চাইতে পারেন, কেমন স্বস্তির ছিল তাঁদের ঈদযাত্রা।
২.
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে দেড় মাস হলো। সড়ক, রেল ও নৌপথের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমধান করার জন্য তা যথেষ্ট সময় নয়। কিন্তু সমস্যাগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর করা ও সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া শুরু করার জন্য যথেষ্ট। মাননীয় মন্ত্রী চাইলে এবারের ঈদযাত্রায় ঘটা দুর্ঘটনাগুলোর পেছনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো দিয়েই তা শুরু করতে পারেন।
কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনর কথাই ধরা যাক। দেশে বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনার কারণ হলো অনেক রেলক্রসিংয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না বা থাকলেও সেগুলো সময়মতো নামানো হয় না। বৈধ-অবৈধ রেলক্রসিংয়ের দায়দায়িত্ব নিয়ে সড়ক ও রেল মন্ত্রণালয়ের ঠেলাঠেলিতে বিপন্ন হয় মানুষের জীবন। তারপর দুর্ঘটনা ঘটলে নিচের স্তরের কর্মীদের শাস্তি দিয়েই দায় সারা হয়।
এবারের ঘটনাতেও দেখা গেছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শুধু গেটম্যানদের ওপর দায় চাপিয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে, এ দুর্ঘটনার পেছনে রেলওয়ে বিভাগের কর্মীদের কয়েক স্তরে দায়িত্ব অবহেলার সম্পর্ক রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার নেপথ্যের কারণ হিসেবে ঘটনাস্থল পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ের চার গেটম্যান ছাড়াও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর লেভেল ক্রসিংয়ের দুই গেটম্যান, লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার, ট্রেনের দুজন চালক বা লোকোমাস্টার, বাসের চালকের অদক্ষতা ও পরিবহনের সঠিক সিদ্ধান্ত না থাকা এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্মাণকাজে অবহেলার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এর জন্য দায়ী সব স্তরের ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেন রেলক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার বা গেট না নামিয়ে কোনো ট্রেন চলাচল করতে না পারে। এ ক্ষেত্রে ভারতের দৃষ্টান্তটি গুরুত্বপূর্ণ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দুর্ঘটনায় নিহত
- ঈদযাত্রা