দাহকাল উতরানো কতটা সহজ
কোভিড-১৯ মহামারির ধকল কাটিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও যখন অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্বের নামীদামি সব সংবাদমাধ্যমসহ সাধারণ মানুষ একে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বললেও কার্যত এটি রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর যুদ্ধ।
এর কঠিন প্রভাব পড়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অর্থনীতির ওপর। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ওই যুদ্ধের ফলে অস্থির হয়ে ওঠে জ্বালানি তেলের বাজার। খাদ্যপণ্য ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হয় মারাত্মকভাবে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন হতে থাকে। ডলারের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমদানি পণ্যের দামও। মূল্যস্ফীতির কারণে জিনিসপত্রের দাম লাগামছাড়া হয়ে যায়। সব মিলিয়ে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।
ইউক্রেন যুদ্ধ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে থামিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বছরাধিককালেও করে উঠতে পারেননি কিছুই। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারকালে বারবার বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সেই নির্বাচনে জিতে ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণ করেন ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি। তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পূর্ণ হয়েছে দুই মাসের বেশি সময় আগে। কিন্তু এত দিনেও ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা তো দূরের কথা, উল্টো যুদ্ধকে তিনি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে উদ্যত। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক অপহরণ করে নেওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি চির দোসর ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে হামলে পড়েছেন ইরানের ওপর। ফলে যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধটি হাজার মাইল দূরে হলেও তার অর্থনৈতিক ধাক্কায় এরই মধ্যে ধুঁকতে শুরু করেছে বাংলাদেশের শিল্প-অর্থনীতি তো বটেই, এমনকি বাড়ির রান্নাঘর পর্যন্ত। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পক্ষে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়ে থাকে।
ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটতেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। জ্বালানি আমদানি, উপসাগরীয় শ্রমবাজার ও বৈশ্বিক শিপিং রুটের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দ্রুতই চাপ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বিশ্বায়নের এই কালে দূরের কোনো যুদ্ধও শেষ পর্যন্ত কাছের বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়।
এরই মধ্যে দেশের জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রথম বড় পরীক্ষা। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বিএনপি যে অর্থনৈতিক দর্শন লালন ও ধারণ করে, তা দিয়ে কি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব?
পুঁজির মুনাফালিপ্সাই ডেকে আনে যুদ্ধ। পুঁজির মূল ধর্ম ও লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন। পুঁজি বা মূলধন সব সময় সর্বোচ্চ মুনাফা খোঁজে। পুঁজির অদম্য মুনাফার লোভ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, পর্যাপ্ত মুনাফা (যেমন ১০০ বা ২০০ শতাংশ) নিশ্চিত হলে পুঁজিপতিরা নৈতিক বা আইনি ঝুঁকি এমনকি চরম আত্মহত্যার ঝুঁকি নিতেও পিছপা হন না। পুঁজির এই ধর্মের কারণেই সাম্রাজ্যবাদী স্তরে যুদ্ধ ছাড়া পুঁজিবাদ টিকতে পারে না। বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের আবির্ভাব ঘটেছে প্রায় সোয়া দুই শ বছর আগে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় পুঁজিবাদের আয়ু বাড়ালেও তা চিরস্থায়ী হতে পারে না। মানুষ নিজের তাগিদেই নতুন আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে ব্রতী হবে। ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহ মানুষকে সেদিকে ধাবিত করবে—এটিই স্বাভাবিক।
- ট্যাগ:
- মতামত
- তেলের দাম বৃদ্ধি
- জ্বালানি সংকট