মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ না হলে যুদ্ধ লেগেই থাকবে
যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২৩ মার্চ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইরানের কাছে যে প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সেটি কতটা আন্তরিকতাপূর্ণ আর কতটা তাদের চতুর কৌশল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পাওয়া পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা এ যুদ্ধ বন্ধে কোনো অবদান রাখতে পারবেন—পাকিস্তানের গত আট দশকের ইতিহাস অন্তত তেমনটি বলে না। তাঁরা বরং যুদ্ধ বাধাতেই অধিকতর পটু ও আগ্রহী এবং সে তুলনায় স্বেচ্ছায় যুদ্ধ বন্ধের রেকর্ড তাঁদের নেই বললেই চলে। যুদ্ধের ইতিহাসে তাঁদের আত্মম্ভরিতা ও আত্মসমর্পণ আছে, কিন্তু কোনো সমঝোতার ইতিহাস নেই। তো যাঁদের নিজেদের ইতিহাসে কোনো সমঝোতা নেই, তাঁরা অন্যদের সমঝোতায় আনবেন কেমন করে? তা ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের নিজেদের সম্পর্কই যেখানে দয়া ও করুণার, সেখানে তাঁরা দূতিয়ালির দায়িত্ব পালন করবেন—এটি শুনতেও কেমন অস্বস্তিকর লাগে! সে যাই হোক, সময়ই বলবে এ ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে। আর তাই এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের পাকিস্তানভিত্তিক সমঝোতার আলোচনা বাদ দিয়ে বরং এ বিষয়ে ইরানের দেওয়া প্রতিক্রিয়া ও তদ্সংশ্লিষ্ট বৈশ্বিক বাস্তবতা নিয়ে খানিকটা আলোচনা করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধসহ পাঁচ দফা শর্ত উত্থাপন করেছে। শর্তগুলো খুবই স্পষ্ট এবং সর্বশেষ বিশ্বজনমতের সঙ্গেও সেগুলো সংগতিপূর্ণ, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষাকারী পশ্চিমা গণমাধ্যম এগুলোকে খুবই কঠিন শর্ত বলে উল্লেখ করেছে। তবে শর্তগুলো কঠিন কি নরম, তার চেয়েও বড় কথা, এগুলো শুধুই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যুদ্ধ বন্ধের কথা। কিন্তু পৃথিবী ও তার যুদ্ধগুলো তো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ফলে তর্কের খাতিরে বলছি, ইরানের প্রস্তাব মেনে (যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মানার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে) মধ্যপ্রাচ্যে যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়েও যায়, তথাপি পৃথিবীর অন্যত্র যুদ্ধের ঝুঁকি ও আশঙ্কা থেকেই যাবে। আর এ ঝুঁকি ও আশঙ্কার পেছনকার অন্যতম কারণ হচ্ছে নিজ দেশের বাইরে পৃথিবীর ৪০টির বেশি দেশে বিপুল পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্যসামন্ত নিয়ে ব্যাপক পরিসরে গড়ে ওঠা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর উপস্থিতি। এ সামরিক ঘাঁটিগুলোই বস্তুত বিশ্বব্যাপী নানামাত্রিক কলহ-বিবাদ ও উত্তেজনা-অশান্তি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক ভূমিকা রাখছে।
এসব সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির কারণেই যুদ্ধ একবার দুই কোরিয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয়ে পরে তা দুই ভিয়েতনামের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। সেটি শেষ হয়ে গেলে আবার তা গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয় সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে। সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে মিলমিশ হয়ে গেলে আবার তা শুরু হয় দজলা-ফোরাতকে আশ্রয় করে ইরাক ও ইরানের মধ্যে। সেই যুদ্ধের ফাঁকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রসমূহের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কাজটি মোটামুটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার পর যুদ্ধ থামে বটে। কিন্তু অচিরেই দৃশ্যপটে হাজির হন ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই আদর্শিক জ্ঞাতি রোনাল্ড রিগ্যান, যিনি তাঁর ক্রুদ্ধ রোষানল দিয়ে ফিলিস্তিনসহ ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোকে যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছারখার করে দেন। তারপরও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর কাজ থেমে থাকে না। ট্রাম্পের জ্ঞাতিভ্রাতা জর্জ ডব্লিউ বুশের নেতৃত্বে শুরু হয় ইরাক আক্রমণ। ইরাকের পর এখন তা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপে আবির্ভূত হয়েছে। আর এই সবগুলো ক্ষেত্রেই যুদ্ধোক্তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তেলক্ষেত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ-স্থাপনার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বাধাহীন সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সে ক্ষেত্রে সহায়ক হাতিয়ার হচ্ছে দেশে দেশে থাকা এই মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো।
অতএব প্রতীয়মান হচ্ছে যে নিজের ভ্রান্তিপূর্ণ আগ্রাসী যুদ্ধ-উদ্যোগে নিজ দেশের জনগণ ও তার দীর্ঘকালীন মিত্রদের সমর্থন না পেয়ে ট্রাম্প যদি এই মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামিয়েও দেন, তবু পৃথিবীর অন্যত্র যুদ্ধ থেমে যাবে না। এমনকি তা থামবে না খোদ মধ্যপ্রাচ্যেও। ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন—সর্বত্রই এ যুদ্ধ এখনো সারাক্ষণ লেগেই আছে—কখনো ভয়ংকর তাণ্ডবতা নিয়ে আবার কখনোবা খানিকটা মৃদুলয়ে। আর ইরানের সঙ্গে সাময়িকভাবে যুদ্ধ বন্ধ রেখে ট্রাম্প যদি আবার দিক পরিবর্তন করে শিগগির কলম্বিয়া কিংবা কিউবা আক্রমণ করে বসেন, তাতেও এতটুকু অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, ‘গুয়েনতানামো বে’সহ দক্ষিণ আটলান্টিকে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো অনেক দিন ধরেই অনেকটা অলস বা অর্ধ-অলস অবস্থায় বসে আছে। কিন্তু এ ঘাঁটিগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অন্তর্গত উদ্দেশ্য তো বিশ্বব্যাপী সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও লুণ্ঠনের কাজে এগুলোকে সর্বক্ষণ ব্যস্ত ও কার্যকর রাখা। ফলে এ ঘাঁটিগুলোকে কার্যকর রাখতে গিয়ে ইরানের পর তারা যে অনিবার্যভাবেই অন্য কোথাও যুদ্ধাক্রমণ ফাঁদবে, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়।
খ্রিষ্টীয় আঠারো শতকের গোড়া থেকে শুরু করে বিশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশই ছিল পুঁজিতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণের নিয়ন্ত্রণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সে ব্যবস্থার সাময়িক অবসান ঘটলেও নতুন পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা এখন আগের চেয়েও অধিক নিষ্ঠুর চরিত্র নিয়ে পৃথিবীর সর্বত্র একযোগে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে শোষকেরা তার নিজ দেশের জনগণকেও অব্যাহতি দেয় না। এমনকি বড় শোষকেরা শোষণ করে অপেক্ষাকৃত ছোট শোষকদেরকেও। ওই যে যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো আজ বহু বছর যাবৎ সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা (চাঁদা, শুল্কসুবিধা, সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ ইত্যাদি) নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে একচ্ছত্র অন্ধ আনুগত্যসহ প্রশ্নহীন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে এবং নিজেদের সীমানায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে পরম যত্নে পুষছে, সেটিও একধরনের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা নয় কি? আর এতে করে ওই দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব কতটা বহাল আছে, সে প্রশ্নও ওঠে। আশার কথা যে ট্রাম্পের ইরান আক্রমণকে কেন্দ্র করে এই প্রথমবারের মতো হলেও যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক নয়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা গেল।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাল, সেটিকে আসলে যুদ্ধ বন্ধের খুবই আংশিক প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। পৃথিবীতে যদি প্রকৃতই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্র করণীয় হচ্ছে, নিজ দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রসহ আর যাদের যাদের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, অবিলম্বে সেগুলোর সবই প্রত্যাহার করে নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও তার অনুগামীরা এমনি এমনি তা করবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে ইরানের পাঁচ দাবির মধ্য থেকে অন্তত মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার এ দাবিটিকে সামনে রেখে যদি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনমত গড়ে তোলা যায়, তাহলে সব ঘাঁটি না হোক, অন্তত কিছু ঘাঁটি অবশ্যই বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ক্ষমতা হারানোর ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরান আক্রমণে উৎসাহ জোগায় ও চাপ সৃষ্টি করে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অধিকাংশ রাজনৈতিক দলও হয়তো তেমনি যুক্তরাষ্ট্রকে দেশে দেশে তার সামরিক ঘাঁটি টিকিয়ে রাখার অবস্থানকেই সমর্থন করে যাবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শান্তি প্রতিষ্ঠা
- মার্কিন ঘাঁটি