অভিবাসন নীতিতে সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে কি সরকার
প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত তরুণ থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের অদক্ষ যুবক-সবাই এক ধরনের অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। এ বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অস্থিরতা, হতাশা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এ প্রেক্ষাপটে অভিবাসন আর শুধু একটি বিকল্প নয়, এটি হতে পারে একটি কৌশলগত সমাধান; যদি রাষ্ট্র এটি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে পারে। প্রবাসে কর্মসংস্থান একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব কমাতে পারে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে।
‘International Migration in Bangladesh : A Political Economic Overview' গবেষণা প্রবন্ধে আমি দেখিয়েছি, বাংলাদেশে অভিবাসন শুধু ব্যক্তিগত জীবিকা অর্জনের পথ নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি কেন্দ্রীয় অংশ, যেখানে রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশে সরকার বিভিন্ন সময়ে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির গুরুত্ব অনুধাবন করে একে উৎসাহ দিতে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে-প্রণোদনা দিয়েছে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে; কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, এ উদ্যোগগুলো কি একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলের অংশ, নাকি এখনো বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা?
সংখ্যায় সাফল্য, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রম রপ্তানিকারক দেশ। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এমনকি ইউরোপের কিছু দেশেও বাংলাদেশি শ্রমিকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এ সাফল্যের আড়ালে একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। আমরা মূলত নিু দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক রপ্তানি করি। ফলে তাদের আয় কম, কর্মপরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে তাদের অবদান সীমিত। অন্যদিকে, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো দক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে তুলনামূলক কম সংখ্যায় বেশি আয় করছে।
Robyn Rodriguez তার ‘Migrants for Export : How the Philippine State Brokers Labor to the World’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে ফিলিপাইন রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে শ্রম রপ্তানিকে একটি উচ্চমূল্যের অর্থনৈতিক খাতে পরিণত করেছে-যেখানে শ্রমিকদের দক্ষতা, বাজার বিশ্লেষণ ও কূটনীতি একত্রে কাজ করে। অর্থাৎ, শুধু কতজন শ্রমিক যাচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়-তারা কত আয় করছে সেটিই আসল প্রশ্ন।
অভিবাসন : বাজার নয়, রাষ্ট্রের কৌশলগত ক্ষেত্র
বাংলাদেশে এখনো অভিবাসনকে অনেকাংশে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, অভিবাসন আসলে একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার আওতায় একটা অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া।
Anna Romina Guevarra তার 'Marketing Dreams, Manufacturing Heroes’ বইয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্র, বেসরকারি এজেন্সি এবং বৈশ্বিক বাজার একত্রে কাজ করে একটি ‘অভিবাসন সংস্কৃতি’ তৈরি করে, যেখানে বিদেশে কাজ করাকে শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং একটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও কাঙ্ক্ষিত পথ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ বিশ্লেষণ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায় যে, অভিবাসনকে সফল করতে হলে রাষ্ট্রকে সক্রিয়ভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সংগঠিত করতে হয়।
সমস্যা শুধু প্রশাসনের নয়, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারেরও
বাংলাদেশে অভিবাসন খাতের সীমাবদ্ধতা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে নয়, এটি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। আমার উল্লিখিত প্রবন্ধে দেখিয়েছি, বাংলাদেশ সরকার অভিবাসনকে ইতিবাচকভাবে দেখে এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে, কিন্তু বাস্তবে এ খাত এখনও অনেকাংশে পরিবার ও ব্যক্তিনির্ভর এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে, যেখানে সরকারের সরাসরি অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। এর পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে-অভিবাসনকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাত হিসাবে না দেখা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দালাল ও বেসরকারি স্বার্থগোষ্ঠীর শক্তিশালী প্রভাব। ফলে সরকার অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নিলেও তা কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর আনতে পারছে না।
এ সরকার কি পারবে অভিবাসনকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বানাতে? এখন প্রশ্নটি সরাসরি রাজনৈতিক-বর্তমান সরকার কি অভিবাসন খাতকে নতুনভাবে কল্পনা করতে প্রস্তুত? Rodriguez দেখিয়েছেন, একটি কার্যকর শ্রম রপ্তানিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রকে শুধু নিয়ন্ত্রক হিসাবে নয়, বরং সক্রিয় ‘ব্রোকার’ হিসাবে কাজ করতে হয়, যেখানে বাজার গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, কূটনীতি এবং প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক একত্রে কাজ করে। এটি কোনো ছোটখাটো প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি একটি বৃহৎ নীতিগত ও রাজনৈতিক রূপান্তর।
বৈশ্বিক শ্রমবাজারকে লক্ষ্য করে রাষ্ট্রের কৌশল নির্ধারণ
বাংলাদেশ যদি সত্যিই অভিবাসনকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কৌশলে রূপান্তর করতে চায়, তাহলে প্রথম ধাপ হবে বৈশ্বিক শ্রমবাজার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করা। Rodriguez-এর গবেষণায় দেখা যায়, সফল শ্রম রপ্তানিকারক রাষ্ট্রগুলো নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করে এবং সেই অনুযায়ী তাদের শ্রমিকদের প্রস্তুত করে। বাংলাদেশে এ ধরনের একটি সমন্বিত গবেষণা ও তথ্যব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে সুযোগ থাকলেও আমরা তা কাজে লাগাতে পারি না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৈদেশিক শ্রমবাজার