একাত্তরের মার্চে মাঠে ও আর্মি মেসে বিভেদের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে
তখন মানচিত্রে ছিল পূর্ব পাকিস্তান। সময়টা ১৯৬৮ সাল। ঢাকা শহরে ভেসে আসছে প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের চিৎকার। হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার হোম গ্রাউন্ডে খেলছেন। গায়ে পাকিস্তান ফুটবল দলের সবুজ-সাদা মেশানো নকশার জার্সি। তাতে বড় করে লেখা নম্বর ১০। পেলের অনুপ্রেরণায় এ নম্বর জার্সিতে নিয়ে খেলতে নামেন হাফিজ উদ্দিন। তবে ঢাকার দর্শকের কাছে তিনি পেলের চেয়েও বড়।
সেদিন পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ষাটের দশকে দেশটি তখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। পাকিস্তানের স্ট্রাইকার হাফিজ সেই দলের খেলোয়াড়দের ড্রিবল করে চলে যাচ্ছিলেন গোলপোস্টের কাছে। প্রথমার্ধেই হাফিজ ডান পায়ের এক শটে বল পাঠিয়ে দিলেন গোলপোস্টে। আর সেই সঙ্গেই স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক চিৎকার করে উঠলেন—জয় বাংলা।
ঢাকায় তখন পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধিতা তুঙ্গে। প্রতিবাদের আগুন ঝরছে চারপাশে। তা থেকে রেহাই পেল না ফুটবল ম্যাচটিও। হাফ টাইমে প্যাভিলিয়নে চলে এল প্রতিবাদী কয়েকজন ছাত্র। তাদের নেতার গায়ে সাদা কোর্তা। পাকিস্তান দলের কোচকে ডেকে সে বলল, ‘আজকে ঢাকার এ ম্যাচে শুধু বাঙালি খেলোয়াড়রাই খেলবে। যদি আপনি তা না করেন তাহলে আমরা এখানে হাঙ্গামা করব।’
পূর্ব বাংলার তখনকার অবস্থা জানা ছিল হাফিজের। ছাত্ররা যে ফাঁকা হুমকি দেয়নি সেটাও তিনি বুঝেছিলেন। কিন্তু হাফিজ এও জানতেন, পাঞ্জাবি খেলোয়াড়দের ছাড়া এ ম্যাচ জেতা অসম্ভব। এদিকে ঢাকায় তার তারকা ইমেজ আছে। সব মিলিয়ে হাফিজের মনে হলো এখানে তার কথা বলা প্রয়োজন। তিনি এগোলেন কয়েক কদম। কিন্তু মুখ খুলতে পারলেন না। হাফিজের মনে পড়ল তার বাবা ডা. আজহার উদ্দিন আহমদের কথা।
হাফিজ উদ্দিনের বাড়ি ভোলায়। পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় দ্বীপ এটি। রোড আইল্যান্ডের চেয়েও বড়। সেখানেই তার বাবা আজহার উদ্দিন থাকেন। ভোলার মানুষের সবচেয়ে শ্রদ্ধার ব্যক্তিদের একজন ছিলেন আজহার উদ্দিন। কেবল ডাক্তার হিসেবেই না, জনপ্রিয়তার কারণ রাজনীতিও। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতেছিলেন তিনি। পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের একচোখা মনোভাবের বিষয়ে বাবার সূত্রে হাফিজ উদ্দিন আরো ভালোভাবে জানতেন। যদিও হাফিজ তখন রাজনীতি নিয়ে ভাবতেন না কিন্তু সেদিন মাঠে কোনো কথা তিনি বলতে পারেননি।
দ্বিতীয়ার্ধে পাকিস্তানের ফুটবল দল আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরতে পারেনি। ৫-১ গোলে সেদিন জিতেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু হাফিজকে ঢাকার দর্শক বরণ করেছিল বীরের সম্মানে। ম্যাচ শেষে হাফিজ উদ্দিন যখন স্টেডিয়ামে চক্কর দিয়ে হাত নাড়ছিলেন, দর্শক হাততালির সঙ্গে চিৎকার করে তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তারা জানত না, তবে হাফিজ জানতেন এটা শুধু ফুটবলার হিসেবে তার শেষ আনুষ্ঠানিক পেশাদার ম্যাচ।
আজহার উদ্দিন চাইতেন তার ছেলে দেশের জন্য কিছু করুক। পরিবারের জন্যও তার করণীয় আছে। পূর্ব বাংলার শিক্ষিত পরিবারের একটি ছেলের করণীয় ছিল ভালো কোনো চাকরিতে যোগ দেয়া। হাফিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন, ফুটবল খেলছিলেন কিন্তু তার কাছে আরেকটি প্রস্তাবও ছিল। পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। হাফিজকে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন পাকিস্তান আর্মিতে যুক্ত হতে। সেদিন মধুর ক্যান্টিনে বসে হাফিজকে পুনরায় প্রস্তাবটি দিলেন সেই মেজর। বললেন, ‘আমি তো দেখছি তুমি কেমন অসাধারণ খেলো। আর্মিতে চলে এসো। আমাদের দলকে কেউ আটকাতে পারবে না।’
হাফিজ তখন মানা করে দিলেন। কিন্তু মেজর তার প্রস্তাবে যেকোনো সময় সাড়া দেয়ার সুযোগ দিয়ে রাখলেন হাফিজকে। এদিকে হাফিজ সেসব একপাশে রেখে ইকবাল হলে বসে তৈরি হচ্ছিলেন একটা পরীক্ষার জন্য। তার মনে তখন নানা রকম চিন্তার ঝড়। তিনি ফুটবল খেলবেন না সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর? তারপর যেমনটা হয় কৃতী পুরুষের ক্ষেত্রে। পরীক্ষার দিন হলে সবাই ছিল। কেবল হাফিজ ছিলেন না। তিনি জাতীয় দলে খেলার জন্য এয়ারপোর্টে রওনা দিয়েছিলেন। আর মেজর সাহেবকে কথা দিয়েছিলেন এক বছর পর আর্মিতেও যোগ দেবেন, তবে প্রয়োজনে ডাক পেলে তিনি খেলবেন জাতীয় দলেও। সেই খেলাই আসলে হাফিজের জীবন বদলে দিয়েছিল। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে তেহরানে খেলতে গিয়েছিলেন তিনি। ইরানের সঙ্গে এক ম্যাচে হারল পাকিস্তান দল। পরের ম্যাচ তুরস্কের সঙ্গে। কোচ তাকে বললেন, ‘এ ম্যাচে অধিনায়কের দায়িত্বটা তুমি নাও।’ ভাবনার বিষয় ছিল দুটো। প্রথমত, অধিনায়কের দায়িত্ব নিলে নিশ্চিত হারের গ্লানির পাশাপাশি দায়ও নিতে হবে হাফিজকে। দ্বিতীয়ত, পাঞ্জাবি খেলোয়াড়রা তার কথা আদৌ শুনবে কিনা।
হাফিজ দায়িত্বটা নিলেন। আর লক্ষ্য করলেন দলটা তার কথা শুনছে। তার নেতৃত্বে পাকিস্তান দল সেদিন অসাধারণ খেলেছিল। যদিও সেদিন কোনো রূপকথার গল্প লেখা হয়নি, কিন্তু পাকিস্তানের দলীয় নিষ্ঠা ও ঐক্য সবার নজর কেড়েছিল। একমাত্র গোলটি এসেছিল হাফিজের পা থেকে কিন্তু তারচেয়ে বড় বিষয়, নিজের মাঝে নেতৃত্বের গুণটি তিনি সেদিনই আবিষ্কার করেন। তবু বাবার চোখে নিজেকে বড় হতে দেখার ইচ্ছাও ছিল হাফিজের। সেই ইচ্ছা এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ভোলায় সত্তরের সাইক্লোন) পূরণ করে দিয়েছিল। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি রওনা দিয়েছিলেন বাড়িতে। হাতে ছিল মায়ের টেলিগ্রাম। তিনি লিখেছিলেন, ‘হাফিজ। বাড়ি ফিরে আয়। অনেকে মারা গেছে। পরিবারের মানুষও আছে।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ