ঈদের আনন্দ ও বাস্তবতা
প্রবাসীদের ঈদ হচ্ছে, মনে শত কষ্ট নিয়ে আপনজনকে বলা ‘হ্যাঁ, আমি ভালো আছি।’ পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা যে আনন্দ আর অনুভূতির জন্ম দেয় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন প্রবাসীরা। ফলে দেশে ঈদ উদযাপন আর প্রবাসে উদযাপনের পার্থক্য অনেক। পরিবারের হাল ধরতে, এমন পরিস্থিতিকে মেনে নেন প্রবাসীরা। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ এ কথা সবাই মানলেও প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। সচ্ছল হওয়ার তাগিদে প্রবাসে পাড়ি জমান তারা। এ কারণে জীবনের অনেক স্বাদ-আহ্লাদ ত্যাগ করেন প্রবাসীরা। আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার পরপরই চারদিকে শোনা যায়, চিরচেনা সেই গান ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...’। সৌদি আরবে শাওয়ালের চাঁদ দেখার পর ঈদ উদযাপিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে ইউরোপ, আমেরিকাসহ পশ্চিমা প্রায় সব দেশেই উদযাপিত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয় কয়েক দিন আগে থেকে। লন্ডনসহ ব্রিটেন জুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপিত হয়েছে। সিয়াম সাধনার মাস রমজান ব্যক্তিজীবনকে সুন্দর, পরিশুদ্ধ ও সংযমী করে। মুমিন মুসলমানরা মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর তাদের জন্য অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। আর ঈদুল ফিতরের উৎসবে সমাজের সব মতভেদ ও সীমানা অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মহামিলন ঘটায় এবং সৃষ্টি করে পরস্পরের প্রতি আন্তরিক মমতা ও শ্রদ্ধাবোধ।
ঈদের চাঁদ উঠলেই প্রবাসীদের চোখের পাতা ভিজে ওঠে। ঈদে প্রবাসীরা মা-বাবার পা ধরে ‘কদমবুচি’ করতে পারেন না। মা-বাবার কবর জিয়ারতও করতে পারেন না। সন্তানদের আদর করতে পারেন না। সন্তানদের নানা রকম বায়না ধরার হাসি-কান্না উপভোগ করতে পারেন না। ঈদের কেনাকাটা নিয়ে গিন্নির মান-অভিমান দেখতে পান না। ছোট বাচ্চাদের ‘ঈদ সালামি’ দিয়ে তাদের ‘তৃপ্তির হাসি’ দেখতে পান না। এই দুঃখ বেশিরভাগ প্রবাসীর। আর ঈদের দিনসহ কয়েক দিন ঘরে ঘরে চলে অন্যরকম আনন্দ। প্রবাসীদের মনে কেবল একটাই যাতনা, এত কষ্টের পরও ছেলেমেয়েদের ঈদের কাপড় কিনে পাঠিয়েই টাকা শেষ। কিন্তু মায়ের জন্য কেনা হয়নি কিছুই। ঠিক এমন সময় দেশ থেকে ফোন আসে। ফোনে ওপার থেকে মা জিজ্ঞেস করেন ‘বাজান কী কর?’ চোখ মুছতে মুছতে আবেগ সামলে রফিক মিয়া বলেন মা, সব বন্ধুবান্ধব মিলে সেমাই খাই। এটাই হলো প্রবাসীর ঈদ। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। যারা একটু পুরনো, বাড়িতে টাকার চাহিদা যাদের একটু কম তারা অনেকে ঈদে বেশ মজা করেন। রান্না করেন সেমাই, পোলাও, গোশত। গায়ে জড়ান নতুন জামা। অনেকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করেন। তবে মিসরে বাংলাদেশিদের অবস্থা কিছুটা ব্যতিক্রম। এখানে সাধারণত দুই শ্রেণির বাংলাদেশি আছেন। ছাত্র এবং গার্মেন্টস কর্মী।
ছাত্রদের হাতে টাকা-পয়সা কম থাকলেও তারা মোটামুটিভাবে ভালোই ঈদ উদযাপন করে থাকেন। যারা হোস্টেলে থাকেন, তারা বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। খাওয়া-দাওয়া সব শেয়ার করেন। নতুন জামাকাপড় পরেন। আর যারা বাসা ভাড়া করে থাকেন, তারা অনেকে আগের রাতেই কিছু রান্না করে রাখেন। ভোরে নামাজ আদায় করে এসে কিছু খেয়ে ঘুম দেন। দুপুরে উঠে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে আড্ডা দেন। সন্ধ্যায় ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ দেন, তারপর রাতভর আড্ডা অথবা নীল নদের পারে ঘুরতে যান। অপরদিকে গার্মেন্টস কর্মীরা ঈদে তিন-চার দিন ছুটি পান। তারা সাধারণত এক সঙ্গে অনেকে থাকেন। কাজেই তাদের ঈদ আনন্দটা একটু বেশি। খাবার আয়োজনেও তারা বেশ মনোযোগী। পাঁচ-সাতজন মিলে রান্না করেন। দুপুরে বিভিন্ন জাগায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যায় অনেক সময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। একসঙ্গে নাচ-গান ও মজা করেন। রাতে শুরু হয় দেশে ফোন করার প্রতিযোগিতা। কারণ পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ। সারাদিন যতই উৎফুল্ল থাকুক, রাতে দেশে কথা বলতে গিয়ে সবাই আবেগী হয়ে ওঠেন। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মেলাতে না পেরে সবাই প্রায় একই মুখস্থ উত্তর দেন ‘অনেক কিছু খাইছি, অনেক মজা করছি, আমি ভালো আছি, আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। এ দিন একজন অন্যজনের দাওয়াতী মেহমান হিসেবে বাসায় আসেন। ঘরোয়া পরিবেশে কতই না মজা হয়। যা এক সময়ে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি হয়ে থাকে। এই আনন্দময় সময় গল্প-গুজব প্রবাসে আধুনিকায়নের যুগে সব থাকা সত্ত্বেও সবকিছু পাওয়া যায় না। তাই ঈদের দিনে বিলেত থেকে মনে পড়ে সবাইকে। প্রবাসে সবই আছে। নেই লাল সবুজের সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামল বাংলাদেশ। ঈদ আছে, নেই ঈদের আনন্দ। প্রতিবেশী আছে, নেই মনের মতো প্রতিবেশী। এই খণ্ড খণ্ড হৃদয়ের চাওয়াগুলো প্রবাসের এত চাকচিক্যের মাঝে মন ভরে না। ফিরে যেতে মন চায় মাটির টানে, স্বদেশের আঙিনায়। মানুষ যেখানে যায়, সেখানে দুটো শক্তিও যায়। এক-বিশ্বাস, দুই-সংস্কৃতি। বিদেশে এ সময়ে যে লাখ লাখ বাঙালি তাদের স্থায়ী নিবাস করে নিয়েছেন, তারাও মূলত এই শক্তিতে বলীয়ান। ধর্ম হচ্ছে, বিশ্বাসের একটি স্তর।
ঈদ এলেই অভিবাসী বাঙালির মনের ক্যানভাসে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো স্বদেশের মুখ। কেমন আছেন স্বজন? কেমন আছে জন্মমাটি? প্রবাসে ঈদের আনন্দ মানে হচ্ছে, এক ধরনের তীব্র শূন্যতা। কথাটি সব প্রবাসীই স্বীকার করবেন একবাক্যে। তার কারণ হচ্ছে, ঈদের দিন এলেই এক ধরনের নস্টালজিয়া মনটাকে ভারি করে তোলে। ফেলে আসা সেই শহর কিংবা গ্রাম, সেই আড্ডা, সেই মধুর স্মৃতি, মা-মাতৃভূমির টান বুকের পাঁজরে দোল খেয়ে যায়। আহা! সোনার আলোয় ভরা সেই দিনগুলো...। প্রবাসে ঈদের অভিজ্ঞতা আমার তিন দশকের বেশি সময়ের। বিদেশের বিভিন্ন দেশে ঈদ করতে গিয়ে যে সত্যটি খুব একান্তভাবে প্রত্যক্ষ করেছি তা হচ্ছে, প্রবাসে একজন বাঙালিই অপর বাঙালির ঘনিষ্ঠ স্বজন। তা পরিচিত হোক অথবা অপরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে ঈদের আনন্দই আলাদা। ইউরোপ-আমেরিকায় সেই আবহের ভিন্নতা স্পষ্ট। তার কারণ হচ্ছে, এখানে ঈদ একটি সম্প্রদায়ের উৎসব, যে সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা পুরো রাষ্ট্রের জনসংখ্যার সামান্য অংশ মাত্র। ব্রিটেনে ক্রমবর্ধমান বাঙালি অভিবাসনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ধর্মীয় কালচারও। বাংলাদেশি স্টাইলে এখানে এখন তৈরি হয় ইফতারি। ভারতীয়-বাংলাদেশি বিপণিবিতানগুলো ঈদ উপলক্ষে সজ্জিত হয় আলোকসজ্জায়। রীতিমতো জমজমাট হয়ে ওঠে ঈদবাজার।