রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য উৎসবের মুহূর্ত হয়ে এলেও, নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি প্রথম অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোটের ফলাফল সংখ্যায় নিরঙ্কুশ হয়েছে, কিন্তু ব্যাংকের হিসাবের খাতায় তো আর রাজনৈতিক স্লোগান জমা রাখা যায় না। বেকার তরুণের কাছে ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি মধুর শোনালেও ভোটের পর তারা চাইবে কাজের বাস্তব সংস্থান।অথচ দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল সন্ধিক্ষণে—ব্যাংকিং খাতের আস্থাহীনতা, বাজারের অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বাড়তে থাকা বেকারত্ব একই সঙ্গে চাপ সৃষ্টি করছে।
এই বাস্তবতা কেবল পরিসংখ্যানের ভাষায় বোঝা যায় না; তা ধরা পড়ে কারখানার বন্ধ দরজায়। রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটা ছোট্ট গার্মেন্টস কারখানা। সকাল সাতটায় খোলার কথা ছিল, এই সেদিন, শ্রমিকরা এসে দেখে গেইট তালাবন্ধ। তাদের চোখে প্রশ্ন, মুখে উদ্বেগ। কারখানার মালিক অবশ্য আগের দিনই বলে গেছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে মেশিন চালু রাখা সম্ভব নয়। এই দৃশ্য শুধু দুয়েকটি কারখানার নয়। সারাদেশে হাজারো ছোট-বড় কারখানা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কাঁচাবাজারের নিস্তেজ ভিড়ে, মধ্যবিত্তের নীরব হিসাব-নিকাশে আশঙ্কা। নির্বাচন ক্ষমতা দেয়, কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য দরকার কাঠামোগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং সাহসী সিদ্ধান্ত। ফলে প্রশ্নটি কেবল নতুন প্রধানমন্ত্রী কী করবেন—সেখানে থেমে নেই।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন আজই। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসার এই মুহূর্তে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে দাঁড় করানো।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের বেশিরভাগ সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। মাত্র তিন বছর আগে যে পরিবার মাসে একবার মাংস কিনতে পারত, এখন তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রই কষ্টে কিনছে। গত সপ্তাহে কাঁচাবাজারে এক মুদি দোকানদারের সঙ্গে কথা হলো। তিনি বলছিলেন, এখন মানুষ প্রতিটি পয়সা হিসাব করে খরচ করছে। আগে দিনে বারো হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হতো, এখন সাত হাজারও হয় না। ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমেছে যে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন শুধু অত্যাবশ্যক খরচই করছে। সন্তানের পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে চিকিৎসা সবকিছুতেই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তারেক রহমানের সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে এই সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফেরানো।
অর্থনীতির এই বিপর্যয় একদিনে তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন মোট ঋণের প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ। পুনঃতফসিল করা এবং আড়াল করা ঋণ যোগ করলে এই সংখ্যা আরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ অনুমোদনে স্বজনপ্রীতি একটি ভঙ্গুর ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তীব্র হয়েছে। উচ্চ সুদের হার ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত রাখছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যবসায়ীরা আস্থাহীনতায় ভুগেছেন। তারা অপেক্ষা করছিলেন একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য।
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এখন আর ছোটখাটো সমাধানে কাজ হবে না। গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই নতুন করে দাঁড় করাতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মনে বিশ্বাস জাগাতে হবে যে তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তারা ব্যবসা করতে পারবেন। এজন্য প্রয়োজন একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া এগুলো অগ্রাধিকার পেতে হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশকে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, মূলধন পর্যাপ্ততা জোরদার করা এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে। পেশাদার ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদদের হাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দিতে পারলে মুদ্রানীতি কার্যকর হবে। ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরবে। ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা বাড়ানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সাধারণ আমানতকারী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ভরসা করবেন।
তবে ব্যাংক সংস্কার করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালে ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে যা খুব দরকার শুধু সেগুলোই আমদানি করতে হবে। অযথা খরচ কমাতে হবে। আর শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর ভরসা করলে চলবে না।