বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি হোক সমতা ও মর্যাদা

যুগান্তর এম হুমায়ুন কবির প্রকাশিত: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৬

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং ঐতিহাসিক কারণে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমরা লক্ষ করি, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বহুপক্ষীয় যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের সর্বত্রই একটা বরফ শীতল অবস্থা বিরাজমান রয়েছে, যা মোটেই কাম্য নয়। আমরা এটাও লক্ষ করেছি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতের নেওয়া কিছু পদক্ষেপের কারণে দুদেশের সম্পর্কে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত বেশ কজন ভারতীয় নাগরিকের হঠাৎ দেশত্যাগ-অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে ভারতে গমন-এ ধরনের আরও কিছু বিষয় সম্প্রতি বারবার আলোচনায় এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে যে শুভেচ্ছাবার্তা প্রেরণ করেছেন, তা ইতিবাচক বার্তাই বহন করছে। নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।


ভারতের প্রধানমন্ত্রী আগে থেকে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অন্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলে তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নাও আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে লোকসভার স্পিকার বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, এমনটিই জানা গেছে। দুদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে একটি প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসাবে আমরা দেখতে পারি।


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যেহেতু দুদেশের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, তাই আস্থার ঘাটতি মেটানোর জন্য দুদেশের নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার পরিধি বাড়াতে হবে; যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বস্তুত দুদেশের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ভিজিট অব্যাহত থাকা দরকার। ভারত ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কড়াকড়ি করা হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভিসা প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ বা স্বাভাবিকীকরণের বিষয়ে অতি দ্রুত গুরুত্ব বাড়ানো দরকার। দুদেশের মধ্যকার রেল যোগাযোগ, বাস যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সেগুলোকে আবারও চালু করার উদ্যাগ নেওয়া যেতে পারে। আমাদের গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে যে চুক্তি আছে, সেটিও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেটি নিয়ে দুদেশের মধ্যে টেকনিক্যাল পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এখন দুদেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।


বিএনপি তাদের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে বলেছে, সীমান্তহত্যা, পুশইন-এগুলো বন্ধ করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। মানুষ আশা করে, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিকীকরণের জন্য ভারতের দিক থেকে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো আছে, সেগুলো দূর করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে নতুন সরকার। আমরাও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নিতে পারি। দুদেশের পারস্পরিক নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা উভয় দেশ উভয় দেশকে একসঙ্গে কাজ করার একটা প্রতিশ্রুতি দিতে পারি এবং অন্য যেসব বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হওয়া দরকার। বস্তুত দুদেশের দিক থেকে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই দেওয়া-নেওয়ার একটা জায়গা তৈরি করা যেতে পারে এবং এ প্রক্রিয়া ঠিকমতো চললে তবেই সম্পর্কটা স্বাভাবিক জায়গায় যেতে পারে। বস্তুত সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিষয়গুলো আছে, দ্বিপক্ষীয় যেসব বিষয় আছে, ত্রিপক্ষীয় বিষয়ও হতে পারে, আঞ্চলিক বিষয়ও হতে পারে-সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।


বলা বাহুল্য, দুদেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করা হবে। আমরা জানি, এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান আছে।


বস্তুত সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টনবিষয়ক জটিলতা, বাণিজ্য, ভিসা সহজীকরণ, ট্রেন-বাস চলাচল এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে আলোচনা-এসব রুটিন ওয়ার্কের মধ্যে সীমিত থাকলে দুদেশেরই ক্ষতি। এসব সমস্যার কোনো-কোনোটির সমাধানের সঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়টিও জড়িত। দুদেশের সরকার চাইলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব।


দুদেশের মধ্যকার বিদ্যমান দূরত্ব কমাতে চাইলে জাতীয় স্বার্থে মৌলিক কিছু বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহমত পোষণ অত্যন্ত জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দল দায়িত্বশীল আচরণ করবে, এটাই প্রত্যাশিত। আমরা ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে চাই; আমরা যদি এ নীতিগত অবস্থানে দৃঢ়তা প্রকাশ করতে পারি-ভারতের কাছে সেই বার্তাটা পৌঁছালে তখন সেই ভিত্তিতেই ভারত বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনায় উদ্যোগী হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে যদি অভ্যন্তরীণ সহমত না থাকে, বিভিন্ন ইস্যুতে যদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন বৃদ্ধি পায়, তাহলে বাইরের শক্তি প্রবেশের একটা সুযোগ তৈরি হয়।


কাজেই আমার ধারণা, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার মধ্যে একটা সুস্পষ্ট বার্তা রয়েছে। দেশের জনগণ চায়, বাংলাদেশ আগামী দিনে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চালু করলে তা যেন সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই চালু হয় এবং সেই ভিত্তিতেই তা অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশের জনগণ চায় না অন্য দেশ আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করুক। এ বার্তাটিও জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে স্পষ্ট হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী দিনে এ বার্তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও